রোববার ইরানের সংসদের এক প্রকাশ্য অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এই চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া কোনো প্রাত্যহিক বক্তব্য বা গণমাধ্যমের প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে তেহরান কখনোই নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণ করে না; বরং শত্রুপক্ষের বাস্তব পদক্ষেপই ইরানের কর্মপদ্ধতির মূল ভিত্তি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথটি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সংসদের স্পিকারের এই কঠোর ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ এবং এর মূল্যবৃদ্ধির মারাত্মক শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধের মুখে ইরান বারবারই নিজেদের ভূকৌশলগত সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে এসেছে।
মোহাম্মদ বাকের কলিবফের এই বক্তব্য মূলত পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের মিত্রদের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা যে, নিজেদের শর্তের বিষয়ে ইরান বিন্দুমাত্র আপস করতে রাজি নয় এবং প্রয়োজনে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার মতো চরম পদক্ষেপ নিতেও পিছপা হবে না।
সংসদে দেওয়া নিজের দীর্ঘ ও বিশ্লেষণী ভাষণে মোহাম্মদ বাকের কলিবফ ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ সংগ্রামের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্ববাসী এখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘটনার প্রথম বার্ষিকীর একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মূল্যায়নের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, গত বছরের ৭ অক্টোবরের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের গতিপথকে চিরতরে পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই অঞ্চলটির ইতিহাস এখন ৭ অক্টোবরের আগের এবং ৭ অক্টোবরের পরের-এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত হয়ে গেছে।
ওই দিন ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা নিজেদের অধিকার, সম্মান ও মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষার তাগিদে যেভাবে প্রবল পরাক্রমে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ছিল এক অভূতপূর্ব বিষয়। তাদের সেই আকস্মিক ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ ইসরায়েলের তথাকথিত অভেদ্য ও নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তার অহংকারকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে এবং ইসরায়েলি নাগরিকদের মনে এক স্থায়ী ও গভীর আতঙ্কের বীজ বপন করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্পিকার কলিবফ এক মহান শহীদ ইমামের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণ করে বলেন, সংঘাতের একেবারে শুরুর দিকেই তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বলেছিলেন যে, ৭ অক্টোবরের প্রতিরোধের মুখে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী যে নজিরবিহীন পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করেছে, তা আর কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়।
সময়ের আবর্তনে আজ সেই নির্ভুল ও সঠিক কৌশলগত বিশ্লেষণের প্রতিটি দিক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বড় বড় সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই অপূরণীয় পরাজয়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, যে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী বিগত কয়েক দশক ধরে সুকৌশলে নিজেদের বিশ্বের সামনে একটি চরম নিপীড়িত ও মজলুম পক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছিল, আজ বিশ্ব জনমতের কাছে তাদের সেই মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো তাদের নির্মম আগ্রাসন তাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে চরমভাবে কলঙ্কিত করেছে। ফলস্বরূপ, পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্যবাদী সরকারগুলোর পক্ষেও এখন এই শাসকগোষ্ঠীকে অব্যাহতভাবে বিপুল সামরিক সরঞ্জাম এবং রাজনৈতিক সমর্থন জুগিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে তাদের ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়েছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর ভঙ্গুরতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে স্পিকার আরও বলেন, যে শাসকগোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে সমগ্র বিশ্বের সামনে নিজেদের সর্বাত্মক সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা ও অপ্রবেশযোগ্য গোয়েন্দা সক্ষমতার এক অলীক দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেছিল, আজ তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষয়িষ্ণু ও সর্বগ্রাসী সংকটের গভীর আবর্তে আটকে পড়েছে।
তাদের জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার মূল ভিত্তি এখন এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। গাজা উপত্যকা এবং লেবাননে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ, নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মাধ্যমে কখনোই ভেঙে পড়া নিরাপত্তার ভিত্তি পুনর্গঠন করা যায় না।
এমনকি প্রধান মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নজিরবিহীন সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পেয়েও এই শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সেই ঐতিহাসিক পরাজয়ের গ্লানি কাটিয়ে উঠতে পারেনি; বরং তাদের বর্তমান নীতি তাদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও বিলুপ্তির দিকেই দ্রুত ধাবিত করছে।
ভাষণের এক পর্যায়ে ইরানের এই শীর্ষ আইনপ্রণেতা সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের চরম অসহায়ত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতিরোধের মুখে কেবল ইসরায়েলিরাই যে চরম হতাশা ও অসহায়ত্বের মধ্যে পতিত হয়েছে তা নয়, বরং ইরানি জনগণ এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধকামী গোষ্ঠীগুলোর অবিচল দৃঢ়তার মুখে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র মার্কিনিরাও আজ চরমভাবে কোণঠাসা ও অসহায় হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরান ও প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিলেও, পর্দার আড়ালে তাদের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অতি সম্প্রতি তারা বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের কাছে বেশ কিছু আপসকামিতামূলক প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করে।
স্পিকার কলিবফ ওয়াশিংটনকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এই রূঢ় বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে যে, কালক্ষেপণ করে বা সময়ক্ষেপণের কৌশল অবলম্বন করে একতরফাভাবে নিজেদের অন্যায্য দাবি অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার যুগ চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।
বর্তমান বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট, অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত। ইসলামাবাদ সমঝোতার চুক্তিতে যে সাতটি মৌলিক শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত জলপথ খোলার বিষয়ে ইরান কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করবে না।
এটি কেবল একটি রাজনৈতিক হুমকি নয়, বরং ইরানের সার্বভৌম অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার এক অবিচল অঙ্গীকার। পরিশেষে তিনি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইরানের নিজস্ব স্বকীয়তা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি জোরালোভাবে বলেন যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বিশ্বের বুকে এমন কোনো দুর্বল বা পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র নয় যে, মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রাত্যহিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা বা গণমাধ্যমে দেওয়া খণ্ডকালীন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তারা নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ করবে।
তেহরানের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক পদক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে শত্রুর প্রকৃত আচরণ, মাঠপর্যায়ের তৎপরতা এবং তাদের বাস্তব পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যমে দেওয়া ফাঁকা বুলি, ভিত্তিহীন কথাবার্তা কিংবা মিথ্যা মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর বিবৃতি কখনোই ইরানের কর্মনীতির ভিত্তি হতে পারে না।
এই অটল অবস্থানের মাধ্যমেই ইরান মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের শর্ত আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের কাছে মাথানত করবে না এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত নির্ণায়ক ও আপসহীন।