তবে সামরিক আক্রমণ বা সরাসরি সংঘাত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কথা বলা হলেও, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার পারদ এখনই পুরোপুরি নামছে না। কারণ, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আমেরিকা যে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, তা আগের মতোই সম্পূর্ণ মাত্রায় বহাল থাকবে বলে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সংগৃহীত তথ্যের বরাত দিয়ে স্বনামধন্য ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি এই গুরুত্বপূর্ণ খবরটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে, যা মুহূর্তের মধ্যেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক লিখিত বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে তার প্রশাসনের অবস্থান একেবারে পরিষ্কার করেছেন।
তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আগামী ৩ নভেম্বরের আগে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী ইরানের ভূখণ্ডে বা তাদের কোনো সামরিক স্থাপনায় কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক কার্যক্রমে অংশ নেবে না। বিশ্ব রাজনীতির এই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে এমন একটি ঘোষণা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে।
এর পাশাপাশি তিনি একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং ইতিবাচক তথ্যও প্রদান করেছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার প্রশাসন এবং ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’-এর শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত ফলপ্রসূ, গঠনমূলক ও ইতিবাচক আলোচনা চলমান রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চরম বৈরী ও সাংঘর্ষিক সম্পর্কের আবহে এই ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনার খবর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না করার মার্কিন এই সিদ্ধান্তটি মূলত একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত, সুদূরপ্রসারী ও নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল।
নির্বাচনের ঠিক আগে মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি স্পর্শকাতর অঞ্চলে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তা মার্কিন ভোটারদের মনস্তত্ত্বে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন জনগণ স্বভাবতই নতুন কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত, প্রাণহানি বা এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতা চায় না।
তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামকে রাতারাতি অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মার্কিন অর্থনীতিতে আঘাত হানবে এবং দেশটিতে চরম মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে, যা নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থেকে কেবল কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করেছেন।
তবে ওয়াশিংটন কেবল কূটনৈতিক আলোচনার ওপরই নির্ভর করছে না, বরং সমান্তরালভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতিও আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করছে। একদিকে যেমন আলোচনার টেবিল প্রস্তুত রাখা হয়েছে, অন্যদিকে বিশাল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তেহরানকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার মার্কিন চিরাচরিত কৌশলও অব্যাহত রয়েছে।
পেন্টাগন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসের শেষ নাগাদ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এই সুবিশাল ও অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে হাজার হাজার সুদক্ষ মার্কিন নৌ সেনা, অত্যাধুনিক ফাইটার জেট এবং বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হবে। এটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা বহন করে, যা ইরানকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে কূটনীতির ব্যর্থতায় ওয়াশিংটন যেকোনো মুহূর্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত।
এই কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে এই প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম।
বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথের সামান্যতম অস্থিরতাও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে সক্ষম। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ইরান একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য শর্তসাপেক্ষে উন্মুক্ত করে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
তেহরানের এই প্রস্তাবের বিপরীতে ওয়াশিংটনও তাদের নিজস্ব কৌশলগত শর্তাবলি যুক্ত করে একটি পাল্টা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো এই পাল্টা প্রস্তাবের বিষয়টি বর্তমানে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের টেবিলে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই এ বিষয়ে ইরানের আনুষ্ঠানিক জবাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেওয়া হবে।
অপরদিকে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখার বিষয়টি তেহরানের জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি ভয়াবহ আঘাত। এই কঠোর অবরোধের ফলে ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তথা তেল রপ্তানি তলানিতে এসে ঠেকেছে।
অর্থনৈতিক এই অপরিসীম চাপের কারণেই ইরান সম্ভবত হরমুজ প্রণালি নিয়ে আপস প্রস্তাবের মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়েছে। তবে ইরানও তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অটল থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরকার কোনোভাবেই দুর্বল হিসেবে প্রমাণিত না হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বক্তব্যে সেই কূটনৈতিক সাবধানতা এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। এই নতুন সামরিক সমাবেশের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের কৌশলগত রদবদলও আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
দীর্ঘতম সময়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, উত্তেজনাকর ও চ্যালেঞ্জিং সামরিক দায়িত্ব পালন শেষে মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ অবশেষে তাদের নিজস্ব ঘাঁটি সান ডিয়েগোর বন্দরে ফিরে এসেছে।
টানা দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে এই রণতরির নাবিকদের মধ্যে চরম মানসিক চাপ, একঘেয়েমি এবং রসদ বা দৈনন্দিন সরবরাহ সংকটের মতো অত্যন্ত গুরুতর সমস্যার খবরও মার্কিন মূলধারার গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
সমুদ্রবক্ষে দীর্ঘদিন পরিবার ও স্বাভাবিক জীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সার্বক্ষণিক যুদ্ধাবস্থার মধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতায় দায়িত্ব পালন করা যে কতটা কঠিন, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি তারই একটি অত্যন্ত বাস্তব ও মর্মান্তিক প্রমাণ।
এশিয়ার কৌশলগত জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের অবস্থান ও গতিবিধিও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত আগস্ট মাসে এশিয়ায় মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে আরেক শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’।
মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখতে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতেই এই তাৎপর্যপূর্ণ রদবদল করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনরত অপর মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ’ কয়েক দিন আগে থাইল্যান্ডের ফুকেটে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছে। বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর এই নিরবচ্ছিন্ন টহল, অবস্থান পরিবর্তন এবং সামরিক উপস্থিতি তাদের নিরঙ্কুশ বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্যেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ঘটনাবলি অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুযুদ্ধ বা প্রক্সি সংঘাত খুব শিগগিরই পুরোপুরি শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত এই অঞ্চলে একটি সাময়িক সামরিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও, মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল এবং ওয়াশিংটনের পাল্টা প্রস্তাবের বিষয়ে তেহরানের আনুষ্ঠানিক উত্তরের ওপর ভিত্তি করেই এই সংবেদনশীল অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারিত হবে।
কূটনৈতিক আলোচনা যদি শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখে, তবে হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও বাধাহীন যাতায়াত নিশ্চিত হবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য একটি অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক খবর বয়ে আনবে।
আর যদি কোনো কারণে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তবে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের মতো প্রমত্ত রণতরিগুলোর উপস্থিতি এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞের দাবানল উসকে দিতে পারে।
তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বকেই এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। আপাতত সারা বিশ্বের নজর এখন তেহরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের দিকে অধীর আগ্রহে নিবদ্ধ রয়েছে।
সংঘাত নয়, বরং কূটনীতির মাধ্যমেই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি সম্মানজনক সমাধান আসবে-এমনটাই প্রত্যাশা করছে শান্তিকামী বিশ্ববাসী। মধ্যপ্রাচ্যের এই চিরস্থায়ী উত্তেজনার অবসান ঘটাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে বিশ্ব অর্থনীতি ও শান্তি কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সাপে-নেউলে সম্পর্কের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।