সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে আজ নিজেরাই চূড়ান্ত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে শত্রুরা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম

ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে আজ নিজেরাই চূড়ান্ত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে শত্রুরা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং তার পশ্চিমা ও আঞ্চলিক প্রতিপক্ষরা। দীর্ঘদিনের এই স্নায়ুযুদ্ধ এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির মাঝে নতুন করে এক কঠোর, সময়োপযোগী ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা প্রদান করেছে তেহরান।

 

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা এবং চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা একসময় ইরানকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলার দুঃস্বপ্ন দেখেছিল, তারা আজ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে এবং চরম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি এই শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার এমন মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির মাত্রাকে আরও গভীরভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।

 

তার এই বক্তব্য কেবল একটি সাধারণ সামরিক হুঁশিয়ারি নয়, বরং এটি দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্বাধীন জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা হিসেবেই বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা।

 

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে এনে প্রতিপক্ষ দেশগুলোর অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।

 

তিনি বলেন, অতীতের প্রতিটি যুদ্ধ, সংঘাত এবং কূটনৈতিক কূটচালে শত্রুদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে উৎখাত করা। পশ্চিমা পরাশক্তি এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক সমীকরণ তৈরি করতে চেয়েছিল, যার মাধ্যমে তারা একটি অখণ্ড ইরানকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে।

 

তাদের প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি সামরিক মহড়া এবং প্রতিটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানি জাতির মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং দেশটিকে চরম ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু ইতিহাসের এক অভাবনীয় বাঁকবদলে আজ সেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

 

যে পরাশক্তিরা একসময় ইরানের পতন নিশ্চিত করার জন্য উল্লাসে মেতে উঠেছিল, আজ তারা নিজেরাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে চরম ধ্বংস ও উৎখাতের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।

 

এই সেনা কর্মকর্তা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল বহুবার তেহরানের দৃঢ় সংকল্প, সামরিক সক্ষমতা এবং জাতীয় ইচ্ছাশক্তি পরীক্ষা করে দেখার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। তারা বারবার ভেবেছে যে তাদের অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম এবং অর্থনৈতিক অবরোধ হয়তো ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করবে।

 

কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি ফ্রন্টে তাদের সেই হিসাব-নিকাশ চরমভাবে ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। অবরোধের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকেও ইরান কেবল নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করেনি, বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সামরিক সক্ষমতায় এক অভূতপূর্ব ও স্বনির্ভর বিপ্লব ঘটিয়েছে।

 

শত্রুরা যখন ইরানের পতন দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল, তখন একটি শক্তিশালী, আত্মমর্যাদাশীল এবং অদম্য ইরান আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির মঞ্চে আগের চেয়েও অনেক বেশি অটল ও মজবুতভাবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল সামরিক বিজয় নয়, এটি ইরানি জাতির প্রবল ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য জয়গান।

 

বক্তব্যের এক পর্যায়ে মেজর জেনারেল আবদোল্লাহি ভবিষ্যতের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির বিষয়ে শত্রুদের অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, ইরানের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যদি পুনরায় কোনো ধরনের ‘ভুল হিসাব’ বা আগ্রাসনের চেষ্টা করা হয়, তবে তার পরিণতি হবে কল্পনাতীত।

 

তেহরান আর কোনোভাবেই কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান তার সামরিক কৌশলকে এমনভাবে সাজিয়েছে যে, শত্রুর যেকোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপের জবাবে আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী, বিধ্বংসী এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

 

এই সতর্কবার্তার মাধ্যমে মূলত তিনি ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, ইরানের সামরিক শক্তি এখন আর কেবল তাদের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ নেই, বরং যেকোনো আগ্রাসনের অত্যন্ত দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা তারা অর্জন করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফের এই বক্তব্য বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি নিখুঁত প্রতিফলন। পশ্চিমা বিশ্ব যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে পর্যুদস্ত, তখন ইরান তার নিজস্ব আদর্শিক বলয় এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলেছে।

 

ফিলিস্তিন, লেবানন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বর্তমানে যে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেখানে ইসরায়েল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা সামরিকভাবে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে। এমন একটি সময়ে ইরানের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই ধরনের বলিষ্ঠ বক্তব্য তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মনোবল বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তাও প্রদান করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ইরানকে উপেক্ষা করার বা সামরিক শক্তির মাধ্যমে দমিয়ে রাখার পশ্চিমা নীতি সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং এটি কেবল আরও বড় ধরনের সংঘাতেরই জন্ম দেবে।

 

পরিশেষে বলা যায়, আলজাজিরার মতো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই সংবাদটি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহির এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।

 

দশকের পর দশক ধরে চলা ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সামরিক হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও যে জাতি নিজেদের অস্তিত্ব কেবল টিকিয়েই রাখেনি, বরং তাকে আরও সুসংহত করেছে, সেই জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার স্বপ্ন দেখা যে চরম বোকামি-সেটিই আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

 

শত্রুরা নিজেদের তৈরি করা আগ্রাসনের ফাঁদে আজ নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছে এবং এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে নিপতিত হয়েছে। অন্যদিকে, আত্মমর্যাদা এবং অদম্য সাহসের ওপর ভর করে ইরান আগামী দিনের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

- আল জাজিরা