ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি মুসলিম নাগরিকদের ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এই বিপুল ভোটদানের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর।
প্রাপ্ত তথ্য ও প্রাথমিক বুথফেরত সমীক্ষা অনুযায়ী, ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে গঠিত বিরোধী দলীয় জোট-উভয় পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এই ঘটনা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে, যেখানে আরব মুসলিমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া কোনো দলের পক্ষেই এককভাবে বা জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই অভাবনীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ, যা নেসেট নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, মোট ১২০টি আসন নিয়ে গঠিত।
গণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থায় কোনো একক রাজনৈতিক দল বা একাধিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোটকে সরকার গঠন করতে হলে কমপক্ষে ৬১টি আসনের জাদুকরী সংখ্যা স্পর্শ করতে হয়। কিন্তু স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হওয়ার পর প্রকাশিত বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষা ও প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, কোনো পক্ষই এই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।
দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেতে পারে সর্বোচ্চ ৫০টি আসন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও কেবল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিন্ন লক্ষ্যে গঠিত বিরোধী দলীয় জোট পেতে পারে ৫৩টি আসন।
অর্থাৎ, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থেকে উভয় পক্ষই বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে। এই ফলাফল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের সাধারণ ভোটাররা এবার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক জোটের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ আস্থা রাখতে পারেননি, যার ফলে দেশটিতে একটি গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
এই তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, নির্ধারক ও আকর্ষণীয় দিকটি হলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বসবাসরত ফিলিস্তিনি মুসলিম নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর অভাবনীয় উত্থান। মূলত দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল-'জয়েন্ট লিস্ট' এবং 'রাম'-এই নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বুথফেরত সমীক্ষা ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দুটি রাজনৈতিক দল যৌথভাবে ১৭টি আসন অর্জন করতে পারে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে। যদি এই পূর্বাভাস চূড়ান্ত ফলাফলে হুবহু প্রতিফলিত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ইসরায়েলের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
এর মাধ্যমে দেশটির পার্লামেন্টে আরব আইনপ্রণেতাদের আসন সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে এক নতুন ও ঈর্ষণীয় উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে যারা রাজনৈতিক মূলধারার বাইরে ছিলেন বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হতেন, সেই ফিলিস্তিনি মুসলিম ভোটাররাই এবার নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি মুসলিম নাগরিকদের ভোটদানের এই উচ্চহার নিছক কোনো কাকতালীয় বা আকস্মিক ঘটনা নয়। প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা পদ্ধতিগত বৈষম্য, মৌলিক নাগরিক অধিকারের বঞ্চনা এবং নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই তারা এবার ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যাপকভাবে উপস্থিত হয়েছেন।
অতীতে অনুষ্ঠিত অনেক নির্বাচনেই আরব ভোটারদের মধ্যে এক ধরণের অনীহা, হতাশা বা সরাসরি ভোট বর্জনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ও চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, রাষ্ট্রের শীর্ষ নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে হলে সংসদীয় রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মজবুত অবস্থান তৈরি করা অপরিহার্য।
এই গভীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক জাগরণের ফলেই ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি বড় ধরনের আঘাত হেনেছে ইসরায়েলের প্রথাগত ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সুরক্ষিত ভোটব্যাংকে।
বর্তমান সংসদীয় কাঠামোর জটিল সমীকরণে 'জয়েন্ট লিস্ট' এবং 'রাম' দল দুটি কার্যত 'কিংমেকার' বা সরকার গঠনের মূল নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বা বিরোধী দলীয় শীর্ষ নেতা-যারাই সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখুন না কেন, তাদেরকে অবশ্যই অত্যন্ত নিরুপায় হয়ে এই ১৭টি আসনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
আরব রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সমর্থন বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাইলফলক অর্জন করা সম্ভব নয়। এর সুস্পষ্ট অর্থ হলো, আগামী দিনে ইসরায়েলে যে সরকারই গঠিত হোক না কেন, তাদের জাতীয় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি মুসলিম নাগরিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও অধিকারগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এটি আরবদের জন্য একইসঙ্গে যেমন একটি বিশাল রাজনৈতিক বিজয়, তেমনি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে রাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির এক অভূতপূর্ব সুযোগ।
দীর্ঘদিনের চরম রাজনৈতিক বৈরীতা ও তিক্ততা ভুলে কোনো কট্টর ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কীভাবে এই আরব দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি বা জোটবদ্ধ হতে সম্মত হয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয়।
দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই ফলাফল এক বিশাল রাজনৈতিক বিপর্যয়। তিনি সবসময় নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছেন। তার রাজনৈতিক জোট মূলত উগ্র ডানপন্থী ও কট্টরপন্থী ইহুদি দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রয়োজনীয় আসন পেতে ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে তার সেই অপরাজেয় ভাবমূর্তি প্রচণ্ডভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। এই জোটের মধ্যে কট্টর ডানপন্থী থেকে শুরু করে মধ্যপন্থী ও বামপন্থী-নানা মতাদর্শের দলের উপস্থিতি রয়েছে।
তাদের একমাত্র সংযোগসূত্র হলো নেতানিয়াহু বিরোধিতা। এখন সরকার গঠন করতে হলে এই বিরোধী জোটকেও আরব দলগুলোর শর্ত মেনে নিতে হবে, যা তাদের নিজস্ব কট্টরপন্থি শরিকদের জন্য মেনে নেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।
মিডল ইস্ট আই-এর সূত্রমতে, এই নজিরবিহীন নির্বাচনী ফলাফল ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। আরব দলগুলো যদি কোনো রাজনৈতিক জোটে সমর্থন প্রদান করতে সম্মত হয়, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর শর্ত আরোপ করবে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে থাকতে পারে আরব অধ্যুষিত শহরগুলোতে রাষ্ট্রীয় বাজেটের আকার বহুগুণ বৃদ্ধি, আবাসন ও অবকাঠামোগত সংকটের দ্রুত সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈষম্যমূলক আইনগুলো অনতিবিলম্বে বাতিলের জোরালো দাবি।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর জন্য রাজনৈতিকভাবে এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও সম্মানহানিকর হলেও, ক্ষমতার মসনদে বসতে হলে তাদের সামনে এই চরম আপস করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
এই জটিল পরিস্থিতি ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে এক নতুন ও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ধর্মীয়, জাতিগত ও আদর্শিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইসরায়েলের এই নির্বাচন শুধু সাধারণ ক্ষমতার হাতবদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে এক সুগভীর ও নীরব বিপ্লবের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি মুসলিম ভোটাররা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব ব্যালট বিপ্লব ঘটিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংঘবদ্ধ ও সচেতন জনমত কতটা শক্তিশালী ও নির্ধারক হতে পারে।
নেতানিয়াহুর জোট এবং বিরোধী জোটের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে চরম ব্যর্থতা মূলত ইসরায়েলি সমাজের ভেতরের গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনকেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। আগামী দিনগুলোতে সরকার গঠনের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক দেনদরবার, আলোচনা ও গোপন সমঝোতা চলবে, তার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবেন এই মুসলিম আইনপ্রণেতারাই।
তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে দেবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত এই দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি। পুরো বিশ্ব এখন অত্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, ইসরায়েলের এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিরসন হয় এবং ফিলিস্তিনি আরব মুসলিমরা দেশটির ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে ঠিক কতটা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, তা দেখার জন্য।