বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের নির্বাচনে আমার সমর্থনেই নেতানিয়াহুর নিশ্চিত পরাজয় ঠেকেছে: ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:২১ পিএম

ইসরায়েলের নির্বাচনে আমার সমর্থনেই নেতানিয়াহুর নিশ্চিত পরাজয় ঠেকেছে: ট্রাম্প
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন ব্যাপক কৌতূহল ও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর দাবি করে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন যে, চলমান এই অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তার প্রত্যক্ষ ও জোরালো সমর্থনের কারণেই মূলত ইসরায়েলের দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি 'নিশ্চিত পরাজয়' থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন।

 

কেবল পরাজয় ঠেকানোই নয়, ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, তার রাজনৈতিক আশীর্বাদের ফলেই নেতানিয়াহু বর্তমান নির্বাচনী অচলাবস্থা কাটিয়ে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত সুযোগ লাভ করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিয়ে পরাশক্তির কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এমন প্রকাশ্য মন্তব্য অত্যন্ত বিরল ঘটনা এবং এটি দুই দেশের মধ্যকার গভীর কিন্তু জটিল কৌশলগত সম্পর্কেরই এক সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।

 

বুধবার, ২৮ অক্টোবর বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই তাৎপর্যপূর্ণ দাবির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সংবাদমাধ্যমটির নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক দীর্ঘ, স্পষ্ট ও সরাসরি বার্তায় এই বিস্ফোরক মন্তব্যটি করেন।

 

সেই বার্তায় ট্রাম্প অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের চরম রাজনৈতিক সংকট ও টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে যখন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল এবং তার পরাজয় একপ্রকার নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন ঘোষণার পর নির্বাচনের সম্পূর্ণ দৃশ্যপট জাদুকরীভাবে পাল্টে যায়।

 

তিনি তার ওই বার্তায় অত্যন্ত জোর দিয়ে দাবি করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সমর্থন ঘোষণার পরই নির্বাচনের গতিপ্রকৃতিতে এই অভাবনীয় পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

 

নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বৈদেশিক নীতির সপক্ষে সাফাই গেয়ে ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ওই পোস্টে আরও যুক্ত করেন যে, তিনি সর্বদা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি, ইসরায়েলের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থের জন্য যা কিছু মঙ্গলজনক, ঠিক সেই পদক্ষেপগুলোই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে গ্রহণ করে থাকেন।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্যটি অত্যন্ত সুকৌশলী এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গভীরভাবে বিশ্বাস করছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাবশালী ইহুদি লবি এবং ইসরায়েলপন্থী রক্ষণশীল ভোটারদের মন জয় করার জন্য মার্কিন রাজনীতিকরা প্রায়শই ইসরায়েল ইস্যুতে সরব থাকেন। তবে একজন মার্কিন নেতার সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে অন্য একটি দেশের নির্বাচনে নিজের ব্যক্তিগত প্রভাবের কৃতিত্ব দাবি করা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের দৃষ্টিকোণ থেকে যথেষ্ট নজিরবিহীন ও বিতর্কিত।

 

ট্রাম্পের এই দাবি দেশের ভেতরে নেতানিয়াহুর জন্য যেমন আশীর্বাদ হতে পারে, তেমনি এটি তার জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বোঝায়ও পরিণত হতে পারে। কারণ, বিরোধীরা ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন যে, নেতানিয়াহু দেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম নীতি নির্ধারণের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিদেশি শক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

 

অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ময়দান ও ভোট গণনার চিত্র বর্তমানে চরম নাটকীয়তা ও শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ ও আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত মোট প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকের সামান্য বেশি ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে।

 

এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ লাখ ব্যালট বা মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৫৬ শতাংশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গণনা করা সম্ভব হয়েছে। এই আংশিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক জোট বর্তমান সংসদীয় সমীকরণে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।

 

তবে এই সাময়িক এগিয়ে থাকা কোনোভাবেই চূড়ান্ত বিজয়ের নিশ্ছিদ্র নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের এক গভীর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পাওয়া এই আংশিক ফলাফলের ভিত্তিতে ১২০ আসন বিশিষ্ট ইসরায়েলি পার্লামেন্ট বা নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট প্রায় ৫৫টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে গাণিতিক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

 

ইসরায়েলের নিয়ম অনুযায়ী সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম ৬১টি আসনের যে জাদুকরী সংখ্যা প্রয়োজন, তা থেকে এই ডানপন্থী জোট এখনও বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে, যা ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বা সাংবিধানিক সংকটের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ময়দান ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত খণ্ডিত এবং বহুমুখী আদর্শের অসংখ্য রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বর্তমান নির্বাচনী ফলাফলের পরিসংখ্যানেও সেই একই চিরচেনা বিভাজিত চিত্র অত্যন্ত প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।

 

দলগতভাবে প্রাপ্ত ভোটের সূক্ষ্ম হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি এখন পর্যন্ত ২০ দশমিক ৭ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে বিরাজ করছে। তবে তাদের ঘাড়ের ওপর প্রতিনিয়ত নিঃশ্বাস ফেলছে বিরোধী শিবিরের শক্তিশালী প্রার্থীরা।

 

নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন 'ইয়াশার পার্টি' ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট নিজেদের ঝুলিতে পুরে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে।

 

অন্যদিকে, ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতা নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন 'টুগেদার' বা ঐক্য জোট ৯ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

 

এই ত্রিমুখী রাজনৈতিক লড়াই দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের সাধারণ ভোটাররা কোনো একক রাজনৈতিক নেতার বা শক্তির ওপর নিরঙ্কুশ আস্থা স্থাপন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাদের সমাজ আজ গভীরভাবে বিভক্ত।

 

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত জোটের অবস্থানও এই নির্বাচনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আংশিক ফলাফলের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, নেতানিয়াহু বিরোধী এই বৃহত্তর এবং আদর্শিকভাবে বিপরীতমুখী জোটটি বর্তমান নেসেটে সম্মিলিতভাবে ৪৯টি আসন পেতে পারে।

 

অর্থাৎ, নেতানিয়াহুর জোট এবং বিরোধী জোট-উভয় পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা থেকে এখনও বহুদূরে অবস্থান করছে। এই বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় চমক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বা 'কিংমেকার' শক্তি হিসেবে সম্পূর্ণ অভাবনীয়ভাবে আবির্ভূত হয়েছে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো।

 

নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্ত প্রাথমিক ও আংশিক ফলাফল অনুযায়ী, এই আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৬টি আসন নিজেদের অধিকারে নিতে যাচ্ছে বলে অত্যন্ত জোরালো আভাস পাওয়া গেছে।

 

যদি এই পূর্বাভাস চূড়ান্ত ফলাফলে অবিকল রূপান্তরিত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ইসরায়েলের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। নেতানিয়াহু বা বিরোধী জোট-যেই সরকার গঠন করতে চাক না কেন, তাদেরকে অত্যন্ত বাধ্য হয়েই এই আরব দলগুলোর সমর্থন বা পরোক্ষ সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হবে।

 

একটি কট্টর ইহুদি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর এমন অভূতপূর্ব ক্ষমতায়ন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত অস্বস্তিকর, নজিরবিহীন ও জটিল এক পরিস্থিতির জন্ম দেবে।

 

সব মিলিয়ে ইসরায়েলের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা সরকার পরিবর্তনের একটি সাধারণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দেশটির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের এক বিশাল পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী মার্কিন নেতার প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ এবং নিজের সমর্থনের কৃতিত্ব দাবি করা মূলত প্রমাণ করে যে, বিশ্ব রাজনীতির দাবাখেলায় ইসরায়েল কতটা গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি। ভোট গণনা যতই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক আকাশ ততই অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে।

 

শেষ পর্যন্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের নিয়ে সমস্ত বাধা পেরিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণ করতে সক্ষম হবেন, নাকি বিরোধী জোট এবং আরব দলগুলো কোনো অভাবনীয় সমীকরণের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করে বিশ্বকে চমকে দেবে-সেই চূড়ান্ত উত্তরের জন্য পুরো বিশ্ব এখন চরম উৎকণ্ঠা, গভীর মনোযোগ ও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

 

- আল জাজিরা