আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর এখন ইরানের এই কঠোর বার্তার দিকে, যা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি একটি প্রত্যক্ষ সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে পার্সটুডে তাদের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, কমান্ডার আবুলফজল শেকারচি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নির্বাচনী পরিস্থিতি এবং বিদায়ী ট্রাম্প প্রশাসনের বৈশ্বিক নীতি নিয়ে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন।
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি মার্কিন রাজনীতির চলমান পালাবদলকে কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ বা সাময়িক রাজনৈতিক ওঠানামা হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তিনি এই পরিস্থিতিকে একটি বৃহত্তর এবং অনস্বীকার্য বাস্তবতার চূড়ান্ত প্রতিফলন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং ক্ষমতার রদবদল দৃশ্যমান হচ্ছে, তা মূলত শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ইরানের দৃঢ় সংকল্পের কাছে মার্কিন আধিপত্যবাদের কৌশলগত পরাজয়েরই একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ।
কমান্ডার শেকারচি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রশাসনের বিভিন্ন বৈদেশিক নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের আগ্রাসী মনোভাব, রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট গুপ্তহত্যা এবং ইরানের ওপর তথাকথিত সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের যে নীতি তারা গ্রহণ করেছিল, তা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অকার্যকর সামরিক কৌশল যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, সে বিষয়টিও তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে, ইরানের নিজস্ব প্রতিরোধমূলক সামরিক সক্ষমতার যে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে, তা আজ বিশ্বের যেকোনো নিরপেক্ষ সামরিক বিশ্লেষকের কাছেই একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অটল সংকল্প, সাধারণ জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং সশস্ত্র বাহিনীর অপরাজেয় মনোবল যে কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ বা হুমকি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত, সে কথা তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সশস্ত্র বাহিনীর এই শীর্ষ মুখপাত্র আরও বিশ্লেষণ করে বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতাপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক নীতি বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, একসময় আগ্রাসী মার্কিন নৌবহর এবং তাদের অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামের যে কথিত শক্তিমত্তার দম্ভ ছিল, তা আজ চরম অবক্ষয়ের সম্মুখীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা ফাঁকা হুমকিগুলো বর্তমানে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যার ফলে হোয়াইট হাউসের তথাকথিত ক্ষমতার ভিত্তি আজ ভেতর থেকেই কেঁপে উঠেছে।
এটি কেবল একটি সামরিক পরাশক্তির অবক্ষয়ই নয়, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যবাদী নীতির এক চরম নৈতিক পরাজয়। সাক্ষাৎকারে কমান্ডার শেকারচি সদ্য বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করতেও পিছপা হননি।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ট্রাম্প এবং তার উগ্রপন্থী, সন্ত্রাসবাদী মানসিকতাসম্পন্ন রাজনৈতিক সহযোগীরা একসময় গর্বিত, প্রাচীন এবং সভ্য রাষ্ট্র ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার এক অশুভ লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মাঠে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই হীন উদ্দেশ্য বুমেরাং হয়ে তাদের দিকেই ফিরে গেছে।
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গিয়ে তারা নিজেরাই আজ কৌশলগত ক্ষয় এবং গভীর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের শিকার হয়েছেন। সর্বোপরি, ইরানের গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ অক্ষের পক্ষ থেকে তাদের ওপর যে ধারাবাহিক ও কৌশলগত পরাজয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারেননি।
পরিশেষে কমান্ডার শেকারচি তার বক্তব্যের উপসংহার টানতে গিয়ে একটি অত্যন্ত দার্শনিক এবং ভূ-রাজনৈতিক সত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারাবাহিক কৌশলগত পরাজয় বিশ্বের সামনে একটি জীবন্ত ও অকাট্য প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, বৈশ্বিক ক্ষমতার সমীকরণ কখনোই কেবল আধিপত্যবাদী বা আগ্রাসী শক্তিগুলোর ইচ্ছা অনুযায়ী নির্ধারিত হতে পারে না।
বরং, ন্যায়বিচার, প্রতিরোধ এবং ঐক্যের শক্তির কাছে যেকোনো পরাশক্তিকেই শেষ পর্যন্ত মাথা নত করতে হয়। ইরানের এই কঠোর অবস্থান এবং আত্মবিশ্বাসী বার্তা আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান-মার্কিন সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।