শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও আধিপত্যবাদের অবসানে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১১ এএম

দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও আধিপত্যবাদের অবসানে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ
ছবি : Collected

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাঠামোগত সংস্কার, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দুর্নীতি নির্মূল এবং সব ধরনের আধিপত্যবাদের অবসানের সুনির্দিষ্ট ও বৃহত্তর লক্ষ্য নিয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভাগীয় শহর রংপুর অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের বহুল আলোচিত লংমার্চ কর্মসূচি শুরু হয়েছে।

 

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশাল রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক জোটের শীর্ষ নেতারা তাদের এই লংমার্চকে কোনো নির্দিষ্ট বা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেশবাসীর সামনে এই বার্তা তুলে ধরেছেন যে, সাম্প্রতিক গণভোটের রায়কে আক্ষরিক অর্থে বাস্তবায়ন করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠন করাই তাদের এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য।

 

এদিন সকাল পৌনে দশটার দিকে গাজীপুরের ব্যস্ততম ভোগরা বাইপাস সড়ক এলাকায় লংমার্চের প্রথম বৃহৎ ও তাৎপর্যপূর্ণ পথসভাটি অনুষ্ঠিত হয়। গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ড. হাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

 

হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, তাদের এই দীর্ঘ যাত্রা মূলত দেশকে দুর্নীতির কালো থাবা থেকে মুক্ত করার এবং বিদেশি বা দেশীয় সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর একটি সম্মিলিত গণপ্রচেষ্টা।

 

তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, ১১ দলীয় জোটের এই রাজপথের আন্দোলন কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় সুবিধা আদায়ের জন্য নয়; বরং গণভোটের মাধ্যমে প্রতিফলিত দেশের সাধারণ মানুষের রায়কে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি রূপ দেওয়ার জন্যই তারা আজ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

 

এই পথসভায় দেশের বর্তমান বিরাজমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও অত্যন্ত কড়া ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা করা হয়। ডা. শফিকুর রহমান তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক কৌশলের দিকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন যে, দলটি শেষ পর্যন্ত হয়তো সঠিক পথে আসবে, তবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা তাদের রাজনৈতিক আচরণে বিদ্যমান।

 

প্রায় একই সুরে কথা বলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি রাজনৈতিক সমালোচনার মাত্রা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে মন্তব্য করেন যে, বিএনপি বর্তমানে একটি সম্পূর্ণ লক্ষ্যহীন এবং সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।

 

দেশকে বর্তমান ফ্যাসিবাদের ভয়াবহ কালো ছায়া থেকে চিরতরে মুক্ত করতে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ ও লাগামহীন লুটপাট বন্ধ করতে ১১ দলীয় ঐক্যের এই আপসহীন লড়াই চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

দেশের চলমান বহুমুখী সংকট নিরসনে কাঠামোগত ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ।

 

তিনি উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করে স্পষ্টভাবে জানান, তাদের এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের অবস্থান রাষ্ট্র বা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে নয়; বরং তারা সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সন্ত্রাস, বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত একটি পরিচ্ছন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান।

 

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার জনগণের এই মৌলিক ও ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সংস্কারের জোর দাবি জানান।

 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক অধিকার আদায়ের এই যাত্রাকে উত্তরের অবহেলিত জনপদের মানুষের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক আশা হিসেবে তুলে ধরেন।

 

তিনি সরকারকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ার করে বলেন, গণভোটের রায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন করে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি, দেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে জড়িত দীর্ঘদিনের দাবি ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নিয়ে সরকারের কোনো ধরনের কালক্ষেপণ বা টালবাহানা আর বরদাশত করা হবে না বলে তিনি কঠোর বার্তা দেন।

 

সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে চরম বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে বলেন, গণভোটের সুস্পষ্ট রায়কে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে সরকার মূলত দেশের আপামর জনসাধারণের সাথে এক বড় ধরনের প্রতারণা করেছে।

 

সরকারের এই চরম ব্যর্থতা ও জনবিরোধী অবস্থানের বার্তা দেশের আনাচে-কানাচে থাকা কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই লংমার্চ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। অবিলম্বে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 

এছাড়া, খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কাশেম ১৮ কোটি মানুষের যৌক্তিক দাবি আদায়ে রাজপথের তীব্র আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সরকারকে যেকোনো মূল্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে।

 

এর আগে, শনিবার সকাল আটটায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এক বিশাল উদ্বোধনী সমাবেশের মাধ্যমে এই লংমার্চ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। উদ্বোধনী সমাবেশ শেষ হওয়ার পর বিশাল গাড়িবহর রংপুরের উদ্দেশ্যে তাদের দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে।

 

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী, খিলক্ষেত এবং উত্তরা পেরিয়ে টঙ্গী হয়ে যখন এই বহর গাজীপুরে পৌঁছায়, তখন রাস্তার দুপাশে অপেক্ষমাণ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, নারী ও পুরুষ ফুল ছিটিয়ে এবং স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগানের মাধ্যমে লংমার্চে অংশগ্রহণকারী নেতাদের উষ্ণ অভিবাদন জানান।

 

পথসভায় অন্যান্য বিশিষ্ট নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ।