মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া হামলার সাহস কেউ পায় না: ডা. শফিকুর রহমান

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া হামলার সাহস কেউ পায় না: ডা. শফিকুর রহমান
ছবি : Collected

রাজধানীর মিরপুরের জনবহুল ও ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে সম্প্রতি সংঘটিত বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, বর্তমান সরকারের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং নীরব সমর্থনের সুযোগ না থাকলে সমাজে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর দুঃসাহস কোনো অপরাধীচক্র দেখাতে পারে না।

 

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মিরপুরের ক্ষতিগ্রস্ত ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে স্থানটি সরেজমিন পরিদর্শন করার পর আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভঙ্গুর জনস্বাস্থ্য খাত নিয়ে কথা বলার সময় তিনি এই কঠোর মন্তব্য করেন।

 

অপরাধী যেই হোক না কেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া বিবেচনা না করে অবিলম্বে আইনের আওতায় নিয়ে আসার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জোরালো দাবি জানান তিনি।

 

দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াত আমির তার বক্তব্যে একটি সুনির্দিষ্ট রূপক ব্যবহার করে বলেন যে, গাছের গোড়া কেটে মাথায় পানি ঢালার মতো আত্মঘাতী নীতি জনগণ আর বরদাস্ত করতে প্রস্তুত নয়।

 

সমাজে অপরাধীচক্রকে পৃষ্ঠপোষণ করে পরবর্তীতে শান্তির বাণী শোনানোর যে দ্বিমুখী নাটক অতীতে মঞ্চস্থ হয়েছে, সচেতন নাগরিক সমাজ তা আর দেখতে চায় না। সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই দেশে সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়, তবে অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত কুশীলবদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

ভবিষ্যতে যেন কোনো দুর্বৃত্ত বা সমাজবিরোধী চক্র দেশের কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে কিংবা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে হাত দেওয়ার সাহস না পায়, তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বনের আহ্বান জানান।

 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে জনমনে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। জনগণের মৌলিক অধিকার ও জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের প্রধানতম সাংবিধানিক দায়িত্ব, যা কোনোভাবেই অবহেলার সুযোগ নেই।

 

বর্তমান জনস্বাস্থ্য খাতের করুণ চিত্র তুলে ধরেন তিনি বলেন যে, একদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার নানামুখী প্রতিশ্রুতির কথা প্রচার করা হচ্ছে, আর অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসাকেন্দ্রে কর্মরত নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক, নার্স ও সাধারণ কর্মচারীদের নানাভাবে অপমান ও নাজেহাল করা হচ্ছে।

 

এই বৈপরীত্যপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পরিবেশে কখনোই দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে কার্যকর ও জনবান্ধব করা সম্ভব নয় বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা এবং মারাত্মক জনবল সংকটের কথা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান জানান যে, খাতের মোট অনুমোদিত ও প্রয়োজনীয় জনবলের মাত্র অর্ধেক লোকবল নিয়ে বর্তমানে কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

 

এই সীমিত সামর্থ্য ও চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও চিকিৎসকরা যখন সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।

 

তাই সরকারকে সব ক্ষেত্রে অত্যন্ত মানবিক, দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক আচরণ করার এবং চিকিৎসালয় ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সকল প্রকার রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন চিরতরে বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

 

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ বিগত কিছুদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা রোধে প্রশাসনের আরও বেশি সক্রিয় ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল।

 

কেবল মিরপুরের এই চিকিৎসাকেন্দ্রে নয়, গত তিন থেকে চার দিনের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের গভীর উদ্বেগজনক চিত্রও তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে বিশদভাবে তুলে ধরেন। মোহাম্মদপুরে প্রকাশ্যে অস্ত্র ও ধারালো চাপাতি হাতে নিয়ে সাধারণ মানুষের বাড়ি দখলের অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।

 

একই সঙ্গে ইসিবি চত্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সাহসী জুলাই যোদ্ধার সৃজনশীল স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। জমিজমার বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের দোহাই দিয়ে গভীর রাতে কোনো আইনি বিধান বা প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই এ ধরনের সশস্ত্র হামলা চালানোর প্রবণতা আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং চরম সামাজিক নৈরাজ্যের লক্ষণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

এই ধরনের ন্যক্কারজনক অপরাধের ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে বা মিথ্যা অপপ্রচারের মাধ্যমে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন জামায়াত আমির।

 

তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং আপসহীন নৈতিকতার পরিচয় দিয়ে বলেন যে, এ ধরনের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যদি তার নিজ দলের কোনো নেতাকর্মীও ন্যূনতম মাত্রায় জড়িত থাকে, তবে তাদেরও বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।

 

এমনকি তিনি নিজে যদি কোনোভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তবুও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো রাখঢাক না করে অবিলম্বে তাকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান, যা তার স্বচ্ছ ও পক্ষপাতহীন রাজনৈতিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

 

আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর তিনি বারবার জোর দেন। সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী পর্বে ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দৃঢ় ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। তিনি জানান যে, দলের পক্ষ থেকে এই চিকিৎসাকেন্দ্রে যে সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে, তা কেবল একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র; এটি কোনোভাবেই শেষ নয়।

 

মিরপুর এলাকার সাধারণ অসহায় মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং তাদের সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে প্রয়োজনে আরও বৃহত্তর পরিসরে এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ক্ষতিগ্রস্ত এই প্রতিষ্ঠানের পাশে থাকবে এবং সব ধরনের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সকল রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে সমাজ থেকে সমস্ত অন্যায়, অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চিরতরে মূলোৎপাটন করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি তার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন।

 

সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে হলে কেবল সাময়িক নিন্দা বা বিবৃতি যথেষ্ট নয়, বরং অপরাধের মূল উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে ধ্বংস করতে হবে। আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখতে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।