তবে সাধারণ ভোটার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল নজর নিবদ্ধ রয়েছে কংগ্রেসের দুই কক্ষ-প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সিনেটের সদস্য নির্বাচনের দিকে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে আগামী দুই বছরের মার্কিন রাজনীতির গতিপথ।
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। এর ফলে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরের যেকোনো প্রশাসনিক সাফল্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা পুরোপুরি ঝুলে আছে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর।
প্রেসিডেন্টের বর্তমান জনপ্রিয়তার রেটিং, মূল নির্বাচনী লড়াইয়ের চিত্র, ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পাওয়া বিভিন্ন ইস্যু এবং রেকর্ড পরিমাণ নির্বাচনী অর্থ খরচের হিসাব-সব মিলিয়ে ক্ষমতার এই লড়াইয়ের ভাগ্য কোথায় নির্ধারিত হতে পারে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা জাগানোর অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমশ নিম্নমুখী জনপ্রিয়তা। ঐতিহাসিক নিয়ম ও পূর্ববর্তী নির্বাচনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার রেটিং থেকেই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে নির্বাচনে তার দল কতটা ভালো কিংবা খারাপ ফলাফল করতে পারে।
নির্বাচনী জরিপভিত্তিক স্বনামধন্য ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল ৫০ শতাংশের কিছুটা ওপরে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে তা দ্রুত কমে ৪০ শতাংশের ঘরে নেমে আসে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প যখন ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের ওপর বিমান হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তার জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল ৪২ শতাংশের ঘরে। তবে হামলার পরপরই তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায় এবং বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৩৭ শতাংশে।
পরিসংখ্যান বলছে, আট বছর আগে, প্রথম মেয়াদের ঠিক এই সময়ে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতার রেটিং ছিল ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদের একই সময়ে এই রেটিং ছিল ৪০ শতাংশ।
অবশ্য দুই ক্ষেত্রেই তৎকালীন প্রেসিডেন্টরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ট্রাম্পের এই নিম্নমুখী রেটিংই ডেমোক্র্যাট শিবিরকে দুই কক্ষ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং যে কারণে তারা এমন সব অঙ্গরাজ্যের দিকে নজর দিচ্ছে, যেগুলো বিগত বছরগুলোতে রিপাবলিকানদের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল।
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ৪৩৫টি আসনের মধ্যে তাদের হাতে রয়েছে ২১৮টি আসন; যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যা। এর বাইরে কেবল একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যিনি নিয়মিত রিপাবলিকানদের পক্ষেই ভোট দিয়ে থাকেন।
প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হওয়ার কারণে এবার সবকটি আসনেই নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে অধিকাংশ আসনেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো সম্ভাবনা নেই, কারণ সেসব আসনে যেকোনো নির্দিষ্ট দলের ভিত্তি এতটাই শক্ত যে বিজয়ী কে হবেন, তা আগে থেকেই প্রায় নিশ্চিত।
নির্বাচনী প্রচার ও ভোটের হিসাব-নিকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘দ্য কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট’-এর গভীর বিশ্লেষণ বলছে, মাত্র ১৮টি আসনে মূল দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা বা ‘টস-আপ’ হতে পারে; যার ফলাফল যেকোনো দিকে যেতে পারে।
এই ১৮টি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকান এবং ৪টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এই ১৮টি আসনের একটিতেও জয় না পেলেও তারা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে, যদি কেবল নিজেদের অনুকূলে থাকা বা কিছুটা এগিয়ে থাকা ৩৬টি আসন তারা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নীতির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে প্রচুর আসন হাতবদল হয়। ১৯৩৪ সালের পর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ২৭টি আসন হারায় এবং গত ২৩টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ৩টিতে ক্ষমতাসীন দল আসন বাড়াতে পেরেছে।
অন্যদিকে, উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা শক্ত। ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকানদের রয়েছে ৫৩টি আসন, আর ডেমোক্র্যাটদের হাতে রয়েছে ৪৫টি। বাকি দুটি আসনে স্বাধীন সদস্যরা থাকলেও তারা সাধারণত ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেই ভোট দেন।
সিনেটররা ছয় বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন বলে প্রতি দুই বছর পর পর সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। রোববারের এই নির্বাচনে ৩৫টি সিনেট আসনে ভোট হচ্ছে। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্য বলছে, এর মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এই ৭টি সমমুখী আসনের ৬টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং ১টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ও ৫১টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে ডেমোক্র্যাটদের এই সমমুখী আসনগুলোর অন্তত ৪টিতে জয়ের পাশাপাশি নিজেদের অনুকূলে থাকা আরও ৪টি আসন সুনিশ্চিত করতে হবে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া মোটেও সহজ কাজ হবে না। তাদের মিশিগানের আসনটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে, যেখানে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বামপন্থী আবদুল এল-সায়েদ এবং রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক এফবিআই এজেন্ট ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাইক রজার্সের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন; যেমন আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইও; সেখানেও ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিনিয়ে আনতে হবে। বিভিন্ন জরিপ অবশ্য বলছে, ডেমোক্র্যাটদের সামনে জয়ের পথ একদম রুদ্ধ নয়।
এমনকি টেক্সাসেও যদি সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো ট্রাম্পের বিশ্বস্ত মিত্র ও রাজ্যের বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করতে পারেন, তাহলে ১৯৮৮ সালের পর তিনিই হবেন ওই রাজ্যটিতে জয়ী প্রথম ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আমেরিকা থেকে জীবনযাত্রার সংকট দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমানে সেই মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ই ভোটারদের জন্য প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে ট্রাম্প সগর্বে দাবি করেছিলেন যে অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি গ্যালন ২.৩০ ডলারের নিচে রয়েছে। কিন্তু এর মাত্র চার দিনের মাথায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম লাফিয়ে গ্যালন প্রতি ৪ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধের প্রভাব এবং আমেরিকানদের দৈনন্দিন খরচে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ায় ইরান যুদ্ধ দিনে দিনে সাধারণ মানুষের কাছে চরম অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আগস্টের এক নির্ভরযোগ্য জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ আমেরিকানই ইরান পরিস্থিতি ট্রাম্প যেভাবে সামলিয়েছেন তা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় ছাড়া ভোটারদের কাছে অন্য দুটি বড় ও স্পর্শকাতর বিষয় হলো স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসন নীতি। ট্রাম্প সম্প্রতি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর পরিসংখ্যান তুলে ধরে তার অভিবাসন নীতিকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশচুম্বী স্বাস্থ্যবিমা খরচ এবং ট্রাম্পের নতুন আইন কীভাবে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগকে সংকুচিত করেছে, তা ভোটারদের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরছেন।
নির্বাচনী সব সমীকরণই আপাতদৃষ্টিতে ডেমোক্র্যাটদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে বলে মনে হলেও ট্রাম্প এবং তার দল যদি সমস্ত জরিপের ফলাফল উল্টে দিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পেয়ে যায়, তাহলে তা মোটেও চমকপ্রদ কিছু হবে না।
কারণ রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী তহবিল। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও তাদের সহযোগী দলগুলোর হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২ কোটি ডলার।
বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের কাছে ছিল ২৩ কোটি ডলারের মতো। এর বাইরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দলের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (ম্যাগা) আন্দোলনের প্রধান তহবিল সংগ্রহকারী শাখা ম্যাগা ইনকের কাছে গচ্ছিত রয়েছে আরও ১৬ কোটি ডলারেরও বেশি।
এই বিপুল অর্থ রিপাবলিকানরা ব্যবহার করছে তাদের ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার ও বিজ্ঞাপনে। গবেষণা সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্ট বলছে, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করা হয়েছে।
রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে ২০ কোটি ডলার বেশি খরচ করেছে এবং সমমুখী লড়াইয়ের সিনেট আসনগুলোর প্রায় সব কটিতেই বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে।
শেষ মুহূর্তের এই বিজ্ঞাপনের জোয়ার রিপাবলিকান সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টানতে সক্ষম হবে এবং ভোটের লড়াইয়ে সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করছেন স্বয়ং ট্রাম্প। ফলাফল যাই হোক না কেন, এই নির্বাচনের পরপরই আমেরিকার রাজনৈতিক মহলের নজর চলে যাবে ২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে।
পুরো মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা একটি বড় ইস্যু হলেও, তার জন্য তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার কোনো সাংবিধানিক সুযোগ অবশিষ্ট নেই। ফলে ভোটার ও রাজনৈতিক মহলের মনোযোগ এখন ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের ভিশন ও নীতি কী হবে, তার ওপর গিয়ে পড়বে; কেবল ট্রাম্পের বিরোধিতার ওপর নয়।