শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসের বৃহত্তম শুদ্ধি অভিযানের মুখে শি জিনপিং, ৯ শীর্ষ জেনারেল বরখাস্ত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৫, ০৬:৩২ এএম

ইতিহাসের বৃহত্তম শুদ্ধি অভিযানের মুখে শি জিনপিং, ৯ শীর্ষ জেনারেল বরখাস্ত
ছবি : ABC News

আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনাম বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের অভ্যন্তরীণ বৃত্তে (inner circle) একটি বড় ধরনের রদবদল বা 'শুদ্ধি অভিযান' হতে পারে বলে ধারণা করছেন চীন বিশ্লেষকরা। বেইজিংয়ে সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া সিসিপি'র ২০৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির এই চার দিনের প্লেনাম বৈঠকে রেকর্ড সংখ্যক রাজনৈতিক শুদ্ধি দেখা যেতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সি চিনপিং তাঁর নেতৃত্ব আরও পোক্ত করতে চাইছেন। এই রদবদলের ফলে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে প্রায় ১৫ জন সদস্যকে অপসারণ বা প্রতিস্থাপন করা হতে পারে। সি চিনপিং ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যা তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করবে। সিসিপি'র বার্ষিক অধিবেশন শুরুর ঠিক দু'দিন আগে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক নজিরবিহীন ঘোষণায় নয়জন শীর্ষ জেনারেলের সিসিপি এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সদস্যপদ বাতিল করেছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সামরিক বাহিনীর ওপর এটি সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য দমন অভিযানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর মাধ্যমে তাঁদের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বহিষ্কারের পথ সুগম হলো।

 

অপসারিত সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন: সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) ভাইস-চেয়ারম্যান হে উইদং, সিএমসি'র রাজনৈতিক কর্ম বিভাগের পরিচালক মিয়াও হুয়া, রকেট ফোর্সেসের কমান্ডার ওয়াং হৌবিন এবং ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডার লিন শিয়াংইয়াংসহ আরও পাঁচজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নয়জন কর্মকর্তা গুরুতর আর্থিক অপরাধে জড়িত সন্দেহে অভিযুক্ত, যা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দেখানো হলেও, বিশ্লেষকরা একে রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান হিসেবেও দেখছেন।

 

এই প্লেনাম সভার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো চীনের পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০) চূড়ান্ত করা। এই রোডম্যাপটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণ করবে। এই পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং সবুজ শক্তি-র মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হবে।

 

তবে, সি চিনপিং কি চতুর্থ মেয়াদে থাকার ইঙ্গিত দেবেন, নাকি তাঁর উত্তরাধিকারীর নাম ঘোষণা করবেন-তা নিয়ে জল্পনা চলছে। বর্তমানে তাঁর তৃতীয় মেয়াদকাল মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্লেনামে সি চিনপিংয়ের উত্তরসূরির নাম ঘোষণার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বন্ড ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক জোনাথন পিং বলেছেন, উত্তরাধিকারীর নাম ঘোষণা করলে তা সি চিনপিংয়ের ক্ষমতাকে দুর্বল করবে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপ বজায় রাখতে তিনি আজীবন ক্ষমতায় থাকতে বদ্ধপরিকর বলে মনে করা হচ্ছে।

 

আগের শুদ্ধি অভিযানে (২০১৭ সালে ১৫ জন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যকে অপসারণ করা হয়েছিল) সি চিনপিং এমন কর্মকর্তাদের অপসারণ করেছিলেন যারা তাঁর বিশ্বস্ত ছিলেন না। কিন্তু এবারের অভিযানে সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনে এমন অনেক কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করা হচ্ছে যাদের শি চিনপিং নিজেই নিয়োগ করেছিলেন—যেমন প্রাক্তন কৃষি মন্ত্রী তাং রেনজিয়ান (যিনি ২৬৮ মিলিয়ন ইউয়ানের বেশি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দণ্ডিত), এবং নিখোঁজ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রদবদলগুলি ক্ষমতা সুসংহত করার প্রয়াস। ড. পিং বলেন, এই শুদ্ধি অভিযান দুর্নীতি দমনের লক্ষ্য হলেও, এর সময় এবং লক্ষ্যবস্তু বিবেচনা করলে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নির্দেশ করে। তাইওয়ানের ন্যাশনাল চেংচি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আর্থার ডিংয়ের মতে, নিজের হাতে গড়া কর্মকর্তাদের অপসারণ সম্ভবত ইঙ্গিত দেয় যে সি চিনপিং 'কিছুটা সন্দেহপ্রবণ' হয়ে উঠছেন এবং তাঁর আনুগত্যের ওপর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এটিকে মাও সে-তুংয়ের শেষ জীবনের আচরণের সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে, যেখানে দক্ষতার চেয়ে আনুগত্যকে বেশি মূল্য দেওয়া হচ্ছে, যা শাসনের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। এই প্লেনাম সভার সমাপ্তির পরেই কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে কাদের বহিষ্কার করা হলো, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যাবে।

 

- ABC News