শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এই শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে নিশ্চিত করেছে। সুপরিচিত ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্টের এক বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি প্রকাশ্যে এসেছে।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একচেটিয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে এবং দীর্ঘদিনের চরম বৈরী রাষ্ট্র ইরানকে আর্থিকভাবে আরও বেশি কোণঠাসা করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বশেষ কৌশলগত পদক্ষেপ বলে গভীরভাবে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
মার্কিন ট্রেজারি বা অর্থ বিভাগের দেওয়া আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত অভিযোগ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া আলোচিত চীনা প্রতিষ্ঠানটির নাম হলো হেংগলি পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি।
মার্কিন সরকারি কর্তৃপক্ষের জোরালো দাবি, এই বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্ববাজারে ইরানের অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক পেট্রোলিয়াম পণ্যের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক ক্রেতা হিসেবে সরাসরি আবির্ভূত হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তারা ইতোমধ্যে কোটি কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ইরানি জ্বালানি তেল গোপনে ও অবৈধভাবে আমদানি করার কাজ সম্পন্ন করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শুধু এই একটি নির্দিষ্ট চীনা পরিশোধনাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অধীনে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করা অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল বা ওএফএসি একই সাথে আরও বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
অত্যন্ত গোপনে পরিচালিত ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা রহস্যময় ছায়া নৌবহরের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকার গুরুতর অভিযোগে তারা প্রায় চল্লিশটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি এবং বৃহদাকার মালবাহী জাহাজের ওপরও একযোগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক, একতরফা ও কঠোর পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক ও তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এর জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম পরাশক্তি চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মার্কিন প্রশাসনের এই ধরনের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ একতরফা ও বেআইনি নিষেধাজ্ঞা হিসেবে স্পষ্টভাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
বেইজিং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের আধিপত্যকামী পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী অবাধ ও স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর।
একই সাথে তারা যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইস্যুকে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অত্যন্ত জোরালো ও প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এটাই প্রথম নয়। এর আগেও মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ইরানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার অভিযোগে চীনের একাধিক সুপরিচিত টিপট রিফাইনারির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
পূর্ববর্তী সময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকার হওয়া চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হেবেই সিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শানডং শৌগুয়াং লুকিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংসিং কেমিক্যাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিশ্ব অর্থনীতির এই দুই বৃহৎ পরাশক্তির মধ্যকার এই চলমান পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলে আগামী দিনে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।