স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে যখন খনির গভীরে এই আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটে, তখন সেখানে ২৪৭ জন শ্রমিক তাদের দৈনন্দিন কাজে নিয়োজিত ছিলেন। চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিপর্যয়কে গত ১৭ বছরের মধ্যে দেশের ‘সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে ভয়াবহ খনি দুর্ঘটনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
দুর্ঘটনার পরপরই শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে প্রশাসনের নির্দেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। আটকে পড়া শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের আশায় ৩৫৪ জন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ উদ্ধারকর্মীর একটি বিশাল দল এই উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয়।
শনিবার ভোর থেকে উদ্ধারকর্মীরা খনির গভীর থেকে একে একে হতাহত শ্রমিকদের বাইরে বের করে আনতে সক্ষম হন। ইতোমধ্যে ৯০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ বাকি নয়জনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন সিসিটিভি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গ্যাস বিস্ফোরণের পরপরই খনিটির ভেতরে বিপুল পরিমাণে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। মূলত শ্বাসরুদ্ধকর এই বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের কারণেই মৃত্যুর সংখ্যা এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
জীবিত উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
দেশের অন্যতম বৃহৎ এই খনি দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এক বিশেষ বার্তায় তিনি নিহত শ্রমিকদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপনের পাশাপাশি তাদের উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
একই সঙ্গে জীবিত উদ্ধার হওয়া আহত শ্রমিকদের সর্বোচ্চ ও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দুর্ঘটনার পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং খনিটির সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে শ্যাংজি চীনের অন্যতম দারিদ্র্যপীড়িত প্রদেশগুলোর একটি হলেও, খনিজ সম্পদে ভরপুর থাকার কারণে এটি দেশটির ‘কয়লার রাজধানী’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমধিক পরিচিত।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে খনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে চীন সরকার ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা এখনো পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে ২০০৯ সালে দেশটির হেইলংজিয়াং প্রদেশের একটি কয়লা খনিতে অনুরূপ এক ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে ১০৮ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। সেই ভয়াবহ স্মৃতিকেই যেন আবারও ফিরিয়ে আনল লিউশেনিউ খনির এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এই দুর্ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।