চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
চীনের অত্যন্ত সুপরিচিত শহর লিউইয়াং, যা মূলত দেশটির আতশবাজি শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, সেখানেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। হুয়াশেং ফায়ারওয়ার্কস ম্যানুফেকচারিং অ্যান্ড ডিসপ্লে কোম্পানি নামের একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানের কারখানায় এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়।
স্থানীয় সময় অনুযায়ী গত সোমবার বিকেল চারটা চল্লিশ মিনিটে (যা বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ছয়টা চল্লিশ মিনিট) এই প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ ঘটে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে নিহতদের বেশিরভাগই ঘটনাস্থলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তাদের হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পরই প্রশাসনের তরফ থেকে জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হয়। অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর প্রায় পাঁচশত প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকেন।
উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কারখানাটির চারপাশের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকার সমস্ত ঘরবাড়ি থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্ঘটনাকবলিত কারখানাটির খুব কাছেই কালো বারুদের দুটি বিশাল গুদাম রয়েছে, যা থেকে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা গণমাধ্যমের কাছে তাদের ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন।
তারা জানান, বিস্ফোরণের সময়কার বিকট শব্দে তাদের বাড়িঘরের দরজা এবং জানালা প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে, যেন শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। তবে ঠিক কী কারণে বা কাদের গাফিলতিতে এমন ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক এই বিস্ফোরণ ঘটল, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
দুর্ঘটনার পরপরই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই মর্মান্তিক ঘটনার তীব্র শোক প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে, এই ঘটনার পেছনে যাদের অবহেলা রয়েছে, সেই কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বব্যাপী আতশবাজি শিল্পে চীন একটি অবিসংবাদিত এবং শীর্ষস্থানীয় নাম। আন্তর্জাতিক বাজারের একটি বিশাল অংশ চীনের দখলে রয়েছে। শুধুমাত্র গত ২০২৫ সালেই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সারা বিশ্বে প্রায় একশো চৌদ্দ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের আতশবাজি রপ্তানি করেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত বছর সমগ্র বিশ্বে মোট যত পরিমাণ আতশবাজি বিক্রি হয়েছে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই সরাসরি চীন থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল। এই ভয়াবহ ঘটনার পর দেশটির অত্যন্ত লাভজনক এই শিল্পের সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।