রোববার বেইজিংয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সংঘাত যেন আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য অবিলম্বে সকল ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধের জোর দাবি জানান।
ওয়াং ই অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, "এই যুদ্ধ কোনোভাবেই হওয়া উচিত হয়নি এবং এই সংঘাত কারও জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না।" তিনি আরও সতর্ক করে দেন যে, সামরিক বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই স্থায়ী সমাধান হতে পারে না; বরং এ ধরনের সশস্ত্র সংঘাত কেবল মানুষের মনে ঘৃণার জন্ম দেয় এবং নিত্যনতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এই অঞ্চলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক এখানকার জনগণ এবং তাদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার কেবল তাদেরই রয়েছে। চীনের এই বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের সাথে খোদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার গোপনীয় প্রতিবেদনেরও আশ্চর্যজনক মিল পাওয়া গেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের একটি গোপন নথির বরাতে জানানো হয়েছে যে, ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েও দেশটির বর্তমান সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে উৎখাত করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
এই প্রতিবেদনটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে খুব সহজেই ইরানের নেতৃত্বকে সরিয়ে তার পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসানো সম্ভব।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার দেশের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত ও সর্বজনস্বীকৃত উপায়।
যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ ফিলিস্তিনিদের নিয়তি হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় চীন তার অবিচল সমর্থন ও জোরালো প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
বৈশ্বিক কূটনীতি ও অন্যান্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে ওয়াং ই জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন সব সময়ই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে বিশ্বাসী। চলমান মতপার্থক্যগুলো দূর করে ২০২৬ সালকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি যুগান্তকারী ও স্থিতিশীল বছর হিসেবে গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এছাড়া বৈরী পরিস্থিতির মাঝেও রাশিয়ার সাথে চীনের বর্তমান সম্পর্ককে 'পাথরের মতো দৃঢ়' বলে আখ্যায়িত করেছেন এই শীর্ষ কূটনীতিক। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও জাপানের সাথেও পারস্পরিক আস্থা ও গঠনমূলক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।
পরিশেষে, তাইওয়ান ইস্যুকে চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং অলঙ্ঘনীয় 'রেড লাইন' বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে বর্ণনা করে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন, বিশ্বের কোনো একক ব্যক্তি বা পরাশক্তিই তাইওয়ানকে মাতৃভূমি চীন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।
তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করার এই ঐতিহাসিক ও অনিবার্য প্রক্রিয়াকে কেউ থামাতে পারবে না। এছাড়া বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা সুসংহত করতে জাতিসংঘের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে সর্বদা সমুন্নত রাখার প্রতি তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান।