এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক হামলায় আরও কয়েক ডজন মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শুধু প্রাণহানিই নয়, রাজধানী মস্কোর বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে পরিচালিত এই ড্রোন হামলার জেরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল মজুতকরণ ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, যুদ্ধরত দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে এ ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের জীবনে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।
ড্রোন হামলার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে রাশিয়ার তাম্বভ অঞ্চল। দেশটির রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৪৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কতোভস্ক শহরে এই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় খুচরা পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান 'ওয়াইল্ডবেরিজ'-এর একটি সুবিশাল গুদামে ইউক্রেনীয় ড্রোন সরাসরি আঘাত হানে।
তাম্বভ অঞ্চলের গভর্নর ইয়েভগেনি পেরভিশভ এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ওই গুদামে ড্রোন হামলার ফলে অন্তত পঁচিশজন কর্মী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক শোকবার্তায় তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে জানান, রাতের শিফটে কর্মরত ওই সাতজন নিরীহ কর্মী হামলার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।
তিনি আরও তথ্য প্রদান করেন যে, মূল হামলার আগে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত আঠাশটি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছিল। পেরভিশভের মতে, যদি ড্রোনগুলো তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পুরোপুরি পৌঁছাতে সক্ষম হতো, তবে ওই অঞ্চলে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারত, যা এক অকল্পনীয় মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিত।
এদিকে, এই জোরালো ড্রোন হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, তাদের সামরিক বাহিনী মূলত রাশিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি রসদ সরবরাহ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে এই নিখুঁত হামলা পরিচালনা করেছে।
কিয়েভের দাবি অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট স্থাপনাগুলো কোনো সাধারণ গুদাম ছিল না; বরং এগুলো সামরিক ড্রোন উৎপাদনের অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রাংশ এবং দিকনির্দেশনা সরঞ্জাম সরবরাহের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট এটিও দাবি করেছেন যে, তাদের ড্রোনের মাধ্যমে রাশিয়ার একটি কৌশলগত তেল স্থাপনাতেও সফলভাবে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে, যা মূলত রুশ বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ধাক্কা।
অন্যদিকে, রাজধানী মস্কো এবং এর আশপাশের অঞ্চলগুলোতেও এই হামলার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মস্কোর পূর্বে অবস্থিত ইলেকট্রোস্তাল শহরে ওয়াইল্ডবেরিজের পরিচালিত অপর একটি সুবিশাল গুদামে ড্রোন আঘাত হেনেছে।
ওই নির্দিষ্ট হামলায় অন্তত চব্বিশজন কর্মী আহত হয়েছেন, যাদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হয়েছে। ড্রোন হামলার ধ্বংসযজ্ঞ এখানেই থেমে থাকেনি। মস্কো অঞ্চলেরই নোগিনস্ক শহরে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা একটি ড্রোনের বিশাল ধ্বংসাবশেষ সরাসরি একটি তেল ডিপোর ওপর আছড়ে পড়ে।
এর ফলে সেখানে মুহূর্তের মধ্যেই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। গভর্নর ভোরোবিয়ভ জানান, তেল ডিপোর ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল যে, চরম নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই তেল ডিপোর কাছাকাছি অবস্থিত একটি প্রসূতি হাসপাতাল থেকে সব রোগী ও চিকিৎসকদের অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই হৃদয়বিদারক ও ধ্বংসাত্মক ঘটনার পর রাশিয়ার ব্যবসায়িক জগতেও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাতিয়ানা কিম এই আকস্মিক হামলাকে সমগ্র রাশিয়া এবং তাদের কোম্পানির জন্য একটি 'ভয়াবহ রাত' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক আবেগঘন বিবৃতিতে তিনি নিহত কর্মীদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই চলমান ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি যখন এই ধরনের হামলাগুলো বাণিজ্যিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর আঘাত হানছে, তখন দুই দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।