শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্স ও স্পেনে স্মরণকালের ভয়াবহ দাবানল, লোকালয়ে ছড়াচ্ছে আগুন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

ফ্রান্স ও স্পেনে স্মরণকালের ভয়াবহ দাবানল, লোকালয়ে ছড়াচ্ছে আগুন
ছবি : Collected

ইউরোপের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র ফ্রান্স এবং স্পেনে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ ও প্রলয়ংকরী দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র দাবদাহ এবং বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ও মারাত্মক প্রভাবে সৃষ্ট এই আগুন বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা সম্পূর্ণ গ্রাস করার পর এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লোকালয় ও শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

 

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন। শনিবার, ২৫ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিস্তারিত ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে ইউরোপের এই চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

 

ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দাবানলের লেলিহান শিখা থেকে সাধারণ নাগরিকদের প্রাণ বাঁচাতে ফ্রান্স সরকার দক্ষিণ-পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ শহর বোর্দো এবং এর পার্শ্ববর্তী আটলান্টিক উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের জরুরি ভিত্তিতে সরে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছে।

 

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ ও চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশটিতে দাবানলের কারণে প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর সবুজ বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জিরোন্দ এলাকা।

 

কেবল এই অঞ্চলটিতেই গত জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর ভূমি দাবানলের আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। আগুন থেকে রক্ষা পেতে ফ্রান্সের ক্যাপ ফেরাত উপত্যকা থেকেই অন্তত ৪০ হাজার মানুষকে অতি দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

 

অন্যদিকে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্পেনের অবস্থাও চরম আকার ধারণ করেছে। রাজধানী মাদ্রিদের ঠিক পূর্বদিকের বেশ কয়েকটি জনবহুল শহরের বাসিন্দাদের জরুরি ভিত্তিতে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ।

 

আগুনের তীব্রতা এবং ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বিবেচনা করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গোটা দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। দাবানলের কারণে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় স্পেনের বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশ পুরোপুরি ঢেকে গেছে, যার ফলে চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, ফ্রান্স এবং স্পেন-এই দুই দেশ মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দুই লাখেরও বেশি সাধারণ নাগরিককে নিজেদের বসতবাড়ি থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এটি সাম্প্রতিক ইউরোপের ইতিহাসে শান্তিকালীন সময়ে অন্যতম বৃহৎ ও বেদনাদায়ক স্থানান্তরের ঘটনা।

 

ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া এই বিপন্ন মানুষদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, পানীয় এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

মানুষের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা বসতবাড়ি চোখের পলকে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়ার দৃশ্য গোটা ইউরোপকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেনের আবহাওয়া দপ্তর আজ বেশ কিছু অঞ্চলে সামান্য বৃষ্টির পূর্বাভাস দিলেও, তা প্রলয়ংকরী এই বিশাল দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য একেবারেই যথেষ্ট হবে না বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।

 

জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো যেকোনো মূল্যে সাধারণ মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষা করা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি আগামী কয়েক ঘণ্টাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, প্রাকৃতিক নিয়মে তাপমাত্রা হয়তো কিছুটা হ্রাস পেতে পারে, তবে বাতাসের গতিবিধি এবং দিক ঠিক কেমন হবে, তা এখনো সম্পূর্ণ অজানা। বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পেলে আগুনের লেলিহান শিখা আরও দ্রুত নতুন নতুন লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল ও বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে।

 

পরিবেশবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইউরোপে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক দাবানলের পৌনঃপুনিকতা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের এক অত্যন্ত ভয়াবহ ও অশুভ সংকেত। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে দ্রুত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী দিনগুলোতে প্রকৃতি আরও বেশি নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

 

বর্তমানে ফ্রান্স ও স্পেনের অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর হাজার হাজার সাহসী কর্মী নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই রাক্ষুসে আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য নিরলস ও আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও হেলিকপ্টারের সাহায্যে আকাশপথে পানি ও রাসায়নিক ছিটিয়ে আগুন নেভানোর সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও, প্রকৃতির রুদ্ররোষের কাছে তা অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হচ্ছে।

 

- সিএনএন