সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নকআউট পর্বে জাপানের মুখোমুখি ব্রাজিল, পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক লড়াইয়ে এগিয়ে কে?

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

নকআউট পর্বে জাপানের মুখোমুখি ব্রাজিল, পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক লড়াইয়ে এগিয়ে কে?
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় মঞ্চে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল এবং এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল জাপান। আগামীকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই মহারণে মাঠে নামবে দুই দল।

 

এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বীরত্বের সাথে নকআউট পর্বে স্থান নিশ্চিত করেছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন খ্যাত সেলেসাওরা।

 

অন্যদিকে, ‘এফ’ গ্রুপে অত্যন্ত দারুণ ফুটবল নৈপুণ্য প্রদর্শন করে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে অদম্য স্পিরিটের দল ব্লু সামুরাই খ্যাত জাপান। ফলে নকআউট পর্বের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপে এশিয়ার পরাশক্তিদের মোকাবিলা করতে হবে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় এই দলটিকে।

 

এই ম্যাচটি শুধু একটি সাধারণ নকআউট ম্যাচ নয়, বরং দুই মহাদেশের ভিন্ন দুটি ফুটবল দর্শনের এক অপূর্ব লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় ব্রাজিল এবং জাপানের মধ্যকার দ্বৈরথের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং পরিসংখ্যানগত দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

 

এখন পর্যন্ত সব ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে মোট ১৪ বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে এই দুটি দল। পরিসংখ্যানের খাতা খুললে ব্রাজিলের একচেটিয়া আধিপত্যই সবার আগে চোখে পড়ে।

 

এই ১৪টি ম্যাচের মধ্যে ১১টি ম্যাচেই নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে জয়ের হাসি হেসেছে ল্যাটিন আমেরিকার দলটি। মাত্র দুটি ম্যাচ অমীমাংসিতভাবে ড্র হয়েছে এবং জাপান নিজেদের অনুকূলে নিতে পেরেছে মাত্র একটি ম্যাচ।

 

পরিসংখ্যানের এই বিশাল ব্যবধান ব্রাজিলের বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের জন্য মানসিকভাবে বেশ স্বস্তিদায়ক একটি বিষয়। তবে, সাম্প্রতিক অতীতের একটি ম্যাচের ফলাফল কিন্তু সেলেসাও সমর্থকদের মনে কিছুটা হলেও অস্বস্তির কালো মেঘ জমিয়ে রেখেছে।

 

বিশেষ করে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত একটি প্রস্তুতিমূলক ম্যাচের ফলাফল ব্রাজিলের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। বিশ্বকাপের ঠিক আগের বছর নিজেদের শক্তি ও কৌশল ঝালিয়ে নেওয়ার সেই লড়াইয়ে ব্লু সামুরাইদের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে ৩-২ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল ব্রাজিল।

 

সেই ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগকে নিজেদের ক্ষিপ্রতা ও ট্যাকটিক্যাল দক্ষতায় বেশ কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল জাপানের আক্রমণভাগ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্রাজিলের বিপক্ষে কোনো ম্যাচে এটিই ছিল জাপানের করা সর্বোচ্চ গোল।

 

ঐতিহাসিক সেই জয়ে এশিয়ান দলটির হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে একবার করে জালের দেখা পেয়েছিলেন তাকুমি মিনামিনো, কেইতো নাকামুরা এবং আয়াসে উয়েদা। অন্যদিকে, ব্রাজিলের হয়ে সেবার গোল করেছিলেন পাউলো হেনরিক এবং গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি।

 

তবে দলের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেই ম্যাচে গোলদাতা পাউলো হেনরিক এবারের বিশ্বকাপ দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেননি। যদিও আরেক গোলদাতা মার্তিনেল্লি দলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে এবারের বিশ্বকাপ মিশনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

 

এই দুই দলের মধ্যকার লড়াইয়ের ইতিহাস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে। ১৯৮৯ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে প্রথমবারের মতো প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও জাপান। সেই ম্যাচে সেলেসাও তারকা বিসমার্কের করা একমাত্র গোলে জয়লাভ করেছিল স্বাগতিকরা।

 

এরপর সময়ের সাথে সাথে দুই দলের মধ্যে আরও অনেক স্মরণীয় লড়াই হয়েছে। এশিয়ান দলটির বিপক্ষে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়টি এসেছিল ১৯৯৫ সালের আগস্ট মাসে। টোকিওতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে কিংবদন্তি কোচ মারিও হোর্হে জাগালোর অধীনে থাকা ব্রাজিল ৫-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে জাপানকে পরাজিত করেছিল, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে অম্লান হয়ে আছে।

 

বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে এই দুটি দল এর আগে মাত্র একবারই একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। দুই দশক আগে, ২০০৬ সালের ২২ জুন জার্মানির ডর্টমুন্ডে অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ে ব্রাজিলের চিরায়ত আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি জাপান।

 

কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদোর দুর্দান্ত জোড়া গোল এবং মিডফিল্ডার জুনিনহো ও গিলবার্তোর একটি করে দৃষ্টিনন্দন লক্ষ্যভেদী শটে ৪-১ গোলের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল ব্রাজিল। সেই জাদুকরী ম্যাচের স্মৃতি বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে ব্রাজিলকে আজও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জোগাতে সাহায্য করে।

 

ব্রাজিল ও জাপানের মধ্যকার লড়াইয়ের গোল-পরিসংখ্যানও অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ব্রাজিলের জন্য দারুণ ইতিবাচক। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৪টি ম্যাচে দুই দল মিলে সর্বমোট ৪৫টি গোল করেছে। এর মধ্যে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা একাই প্রতিপক্ষের জালে বল জড়িয়েছেন ৩৭ বার।

 

অন্যদিকে, শক্তিশালী ব্রাজিলের রক্ষণভাগ ভেদ করে জাপান গোল করতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ৮ বার। এই দ্বৈরথে ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে সবার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছেন ব্রাজিলের সাবেক তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার।

 

২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপসহ জাপানের বিপক্ষে খেলা পাঁচটি ম্যাচে তিনি একাই করেছেন ৯টি গোল। ২০১২ সালে দুটি, ২০১৩ সালে একটি, ২০১৪ সালে চারটি, ২০১৭ সালে একটি এবং সবশেষ ২০২২ সালে একটি গোল করে জাপানের বিপক্ষে নিজেকে একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার।

 

আগামীকালের মহা-গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এক দিকে যেমন ব্রাজিলের সামনে সুযোগ থাকবে নিজেদের ঐতিহাসিক আধিপত্য বজায় রেখে দাপটের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখার, তেমনি জাপানের সামনেও সুবর্ণ সুযোগ থাকবে গত বছরের দুর্দান্ত জয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে বিশ্ব ফুটবলকে আরও একটি বড় চমক উপহার দেওয়ার। ল্যাটিন ছন্দ আর এশিয়ান শৃঙ্খলার এই রোমাঞ্চকর দ্বৈরথটি উপভোগ করার জন্য ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি ভক্ত এখন প্রহর গুনছেন।