বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে আর্জেন্টিনা

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৩:২৮ এএম

খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে চরম নাটকীয়তা আর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের এক মহাকাব্যিক গল্প লিখে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত স্নায়ুক্ষয়ী এই লড়াইয়ে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে পরাজিত করে শিরোপা ধরে রাখার আরও এক ধাপ কাছাকাছি পৌঁছে গেছে লাতিন আমেরিকার পরাশক্তিরা। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে পিছিয়ে পড়েও, শেষ মুহূর্তের অদম্য মানসিকতা ও চমকে বাজিমাত করে লিওনেল মেসির দল।

 

এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ ষাট বছরের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার আক্ষেপ আরও দীর্ঘায়িত হলো। আগামী ১৯ জুলাই শিরোপা নির্ধারণী মহারণে ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেনের মুখোমুখি হবে আলবিসেলেস্তেরা।

 

চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে শুরু থেকেই বেশ কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। কেপ ভার্দে, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের মতো দলগুলোর বিপক্ষে ঘাম ঝরানো জয়ের পর সেমিফাইনালেও তাদের সামনে ছিল অত্যন্ত কঠিন এক সমীকরণ।

 

আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচের প্রথমার্ধে কোনো দলই প্রতিপক্ষের গোলমুখে উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেইনের মতো বিশ্বমানের তারকারা মাঠে উপস্থিত থাকলেও প্রথম পঁয়তাল্লিশ মিনিটে কোনো শট লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয়নি কোনো দলই।

 

বরং নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে মাঠে শারীরিক লড়াইয়ের আধিক্যই বেশি দেখা গেছে। পানি পানের বিরতির আগেই দুই দল মিলে অসংখ্যবার ফাউল করে। প্রথমার্ধ শেষে মোট ১৯টি ফাউলের বাঁশি বাজান রেফারি, যার মধ্যে বারোটি ছিল আর্জেন্টিনার এবং সাতটি ইংল্যান্ডের।

 

তবে রেফারি ইসমাইল বেশ সংযত থেকে কেবল দুটি হলুদ কার্ড প্রদর্শন করেন। এই অর্ধে বল দখলের লড়াইয়ে আটান্ন শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রাখলেও আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ ছিল অনেকটাই নিষ্প্রভ। মেসির একটি ফ্রি কিক ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড পাঞ্চ করে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের গতিপথ ও উত্তেজনা সম্পূর্ণ পাল্টাতে শুরু করে। বিরতি থেকে ফিরে ইংল্যান্ড অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ইংলিশদের অপেক্ষার অবসান ঘটে।

 

ডান প্রান্ত থেকে দারুণ এক দলীয় আক্রমণের পর ডেক্লান রাইসের নিখুঁত ক্রস থেকে বল পেয়ে যান অ্যান্থনি গর্ডন। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় নাহুয়েল মলিনার পেছন থেকে দ্রুতগতিতে বল নিজের আয়ত্তে নিয়ে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান তিনি।

 

এই গোলের সুবাদে দীর্ঘ ছয় দশক পর আরও একবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন বুনতে শুরু করে ইংল্যান্ড শিবির। তবে লিড নেওয়ার পরক্ষণেই রক্ষণাত্মক কৌশলে চলে যায় তারা, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

 

পিছিয়ে পড়ার পর খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চিরচেনা অদম্য মানসিকতা প্রদর্শন করে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। ইংল্যান্ড রক্ষণভাগে পুরোপুরি মনোনিবেশ করায় বক্সের বাইরে থেকে একের পর এক সাঁড়াশি আক্রমণ শানাতে থাকে আর্জেন্টিনা।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে হুলিয়ান আলভারেজের একটি জোরালো শট অসাধারণ নৈপুণ্যে রুখে দেন পিকফোর্ড। এরপর ৬৪ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে আক্রমণভাগে গতি আনেন নিকোলাস গঞ্জালেজ।

 

৬৯ মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রসে গঞ্জালেজের একটি দুর্দান্ত হেড অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে আবারও হতাশ করেন পিকফোর্ড। পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনতে ৭২ মিনিটে স্কালোনি একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন আনেন; মাঠে নামেন রদ্রিগো দে পল, গঞ্জালো মন্তিয়েল ও নিকোলাস ওতামেন্দি।

 

৭৬ মিনিটে দে পলের ক্রসে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসলে হতাশা বাড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। তবে হাল না ছাড়ার যে মন্ত্র কোচ ও অধিনায়কের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল, তার প্রমাণ মেলে ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে। ৮৫ মিনিটে আসে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোল।

 

কর্নার থেকে মেসির বাড়ানো বল পেয়ে পঁচিশ গজ দূর থেকে জোরালো শটে পিকফোর্ডকে বোকা বানান এনজো ফার্নান্দেজ। সমতা ফেরার পর আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। এরপর ম্যাচের যোগ করা সময়ে, অর্থাৎ ৯২ মিনিটে লেখা হয় ইংল্যান্ডের বিদায়ের চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি।

 

অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি শট আবারও গোলপোস্টে লেগে ফিরে এলে, ডান দিক থেকে আসা এক ফিরতি ক্রসে বল পেয়ে যান লাউতারো মার্টিনেজ। অত্যন্ত কাছ থেকে নিখুঁত এক হেডে বল জালে জড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দেন এই তারকা স্ট্রাইকার।

 

নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসার যে হার না মানা মানসিকতা আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে, তা বিশ্ব ফুটবলে নিঃসন্দেহে এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে।