সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিকে গ্রুপ পর্বে রুখে দিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়ে আগেই ইতিহাস রচনা করেছিল তারা। আর এবার শেষ বত্রিশের শ্বাসরুদ্ধকর ও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার চোখে চোখ রেখে যে অভাবনীয় সাহসিকতার প্রদর্শন তারা করল, তা সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে আক্ষরিক অর্থেই অবাক করেছে।
নির্ধারিত নব্বই মিনিটের খেলায় শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমতায় থেকে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ অর্জন নয়। যদিও অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের জয় হাতছাড়া হয়েছে, তবু রেফারির শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্ত পর্যন্ত বুক চিতিয়ে লড়াই করে তারা প্রমাণ করেছে, বিশ্বমঞ্চে তাদের এই অদম্য উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং নিখাদ যোগ্যতা ও নিরলস পরিশ্রমের ফসল।
খেলার ফলাফল শেষ পর্যন্ত নিজেদের পক্ষে না এলেও আফ্রিকার এই ছোট দেশটি ইতোমধ্যে সমগ্র ফুটবল বিশ্বের অগাধ সম্মান ও ভালোবাসা জয় করে নিয়েছে। মাঠে নামার আগেই কেপ ভার্দের প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, যিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে ‘বুবিস্তা’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত, ঠিক এমন এক তীব্র ও উত্তেজনাকর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচের সুস্পষ্ট আভাস দিয়েছিলেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, যখন একটি দল কাগজে-কলমে পরিষ্কার ফেভারিট থাকে, তখন অনেকেই ধরে নেন যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ হয়তো শুরুতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে এবং সহজেই আত্মসমর্পণ করবে।
কিন্তু বুবিস্তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, তাঁরা কেবল অংশগ্রহণের জন্য বা হার মানার জন্য মাঠে নামছেন না; বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের উজাড় করে দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবেন। মাঠে নেমে কোচের সেই সাহসী ও প্রেরণাদায়ী কথার আক্ষরিক প্রমাণ দিয়েছেন তাঁর শিষ্যরা।
তারকায় ঠাসা শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে রীতিমতো কাঁপিয়ে দিয়েছিল নবাগত এই দলটি। একপর্যায়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে ছিটকে পড়ারও প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিয়ে ঘাম ঝরিয়ে ৩-২ গোলের ব্যবধানে কষ্টার্জিত জয় তুলে নিতে সক্ষম হয় আর্জেন্টিনা, তবে কেপ ভার্দে মাঠ ছেড়েছে সত্যিকারের বীরের বেশে।
প্রথমবারের মতো ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে এসে শেষ বত্রিশের লড়াই থেকে বিদায় নিলেও কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা তাঁর দলের সার্বিক পারফরম্যান্স নিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত। ম্যাচ শেষে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি তাঁর দলের অকুতোভয় খেলোয়াড় এবং পরিশ্রমী কোচিং স্টাফদের নিয়ে বুকভরা গর্বের কথা জানান।
বুবিস্তা অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন যে, তাঁরা তাঁদের দেশের জন্য এক বিশাল ও অতুলনীয় সম্মান বয়ে আনতে পেরেছেন। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মতো এক অদম্য শক্তির বিপক্ষে মাঠে নেমে দুবার পিছিয়ে পড়েও অসামান্য দৃঢ়তায় সমতা ফেরানো এবং ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তিনি মনে করেন, এমন একটি পরাশক্তির বিপক্ষে টানা একশত বিশ মিনিট সমানতালে লড়াই করা যেকোনো দলের জন্যই এক বিশাল অর্জন এবং এটি বিশ্ব ফুটবলে তাঁদের নতুন আত্মপরিচয়ের স্মারক।
খেলোয়াড়দের অদম্য মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে বুবিস্তা আরও বলেন, মাঠে তাঁর শিষ্যরা যে সাহস, তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদা দেখিয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়। আর্জেন্টিনা কেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা দল, তা তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় এই ম্যাচে প্রমাণ করেছে।
তবে প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব বিনয়ের সঙ্গে মেনে নিয়েও তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, তাঁর দলের তরুণেরা ম্যাচটি জেতার জন্য নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়েছে। চরম বীরত্বের সঙ্গে খেলে তারা নিজেদের খেলার সহজাত ধরন, আক্রমণাত্মক কৌশল ও আত্মপরিচয়কে কখনোই হারিয়ে যেতে দেয়নি।
বুবিস্তা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, বর্তমান ফুটবল বিশ্বে খুব কম দলই আছে যারা আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রক্ষণভাগ ভেদ করে দুটি গোল আদায় করে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নেওয়ার সামর্থ্য রাখে। এটিই মূলত তাঁর দলের লড়াকু চরিত্র এবং অসাধারণ ফুটবলীয় দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ম্যাচের কৌশলগত দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে কেপ ভার্দের এই অভিজ্ঞ কোচ জানান, আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বমানের দলের বিপক্ষে সামান্যতম ভুলও বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার তিনটি গোলের মধ্যে দুটিই এসেছে স্থির বল বা সেট পিস পরিস্থিতি থেকে।
আর ঠিক এই জায়গাতেই নিজেদের রক্ষণভাগের দুর্বলতা ও ভোগান্তির কথা অকপটে স্বীকার করেছেন বুবিস্তা। একটি নির্দিষ্ট সেট পিসেই তাঁদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তবে পরাজয়ের এই সামান্য আক্ষেপ ছাপিয়েও তিনি তাঁর খেলোয়াড়দের নিয়ে চূড়ান্ত গর্ববোধ করেন।
এই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে কেবল একটি অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি লড়াকু ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের পরিচয় বিশ্ববাসীর সামনে সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।