তবে এবারের যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত আসরে এই মানসিক চাপের সাথে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির চরম বিরূপ আচরণ। বিশেষ করে, শনিবার ফিলাডেলফিয়ার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি নিয়ে গোটা ফুটবল অঙ্গনে দেখা দিয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ম্যাচটি বিশ্বকাপ ফুটবলের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত এবং ভয়াবহ ম্যাচ হতে যাচ্ছে। এমন চরম বৈরী আবহাওয়া ও অসহনীয় তাপমাত্রার মধ্যে খেলোয়াড়দের মাঠে নামানো হলে তা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা।
আর এই গুরুতর শঙ্কার কারণেই পেশাদার ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ফিফপ্রো এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা ম্যাচটি অবিলম্বে স্থগিত করার জন্য বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এক জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর তাদের সর্বশেষ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত দেশটির পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলজুড়ে এই ভয়াবহ এবং প্রাণঘাতী দাবদাহ অব্যাহত থাকবে।
ফিলাডেলফিয়ার যে স্টেডিয়ামে ফ্রান্স এবং প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়রা জয়ের লক্ষ্যে মুখোমুখি হবেন, সেখানে ম্যাচ চলাকালীন সময়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৭৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলবে বাতাসে উপস্থিত অতিরিক্ত আর্দ্রতা। উচ্চ তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার প্রাণঘাতী সংমিশ্রণে মাঠে উপস্থিত ফুটবলারদের কাছে এই গরম সর্বোচ্চ ৪৬ দশমিক ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এমন ভয়ানক ও দমবন্ধ করা তাপমাত্রায় একটানা নব্বই মিনিট বা তারও বেশি সময় ধরে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করা মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর এবং বিপজ্জনক। বিশেষ করে পেশাদার ফুটবলের মতো খেলায় যেখানে খেলোয়াড়দের মাঠে প্রতিনিয়ত তীব্র গতিতে দৌড়াতে হয়, সেখানে এই তীব্র তাপমাত্রার প্রভাব হতে পারে মারাত্মক।
এইবারের বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরমের কারণে খেলোয়াড়দের অবর্ণনীয় ভোগান্তির চিত্র এর আগেই বিশ্ববাসী টেলিভিশনের পর্দায় প্রত্যক্ষ করেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই নিউ জার্সিতে সুইডেনের বিপক্ষে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল তারকাখচিত ফরাসি দল।
সেই ম্যাচ চলাকালীন সময়ে মাঠের তাপমাত্রা ৩২ দশমিক ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে চরম অস্বস্তিতে পড়েন খেলোয়াড়রা। পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে, খেলা চলাকালীন সময়ে মাঠের সাইডলাইনে রাখা জলকামান ব্যবহার করে ফরাসি ফুটবলারদের শরীর ঠান্ডা করতে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে সেই দৃশ্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার পর তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফিফা যদিও খেলোয়াড়দের সাময়িক স্বস্তি দিতে ও সুরক্ষায় ম্যাচগুলোর মাঝপথে পানি পানের বিরতি বা কুলিং ব্রেকের ব্যবস্থা রেখেছে, তবে বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা এই সাধারণ পদক্ষেপকে একেবারেই অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন।
তাদের মতে, যখন পরিবেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে এতটা বেশি থাকে, তখন মাত্র কয়েক মিনিটের পানি পানের বিরতি খেলোয়াড়দের শরীরের মূল তাপমাত্রা কমানোর জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।
খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে পেশাদার ফুটবলারদের ইউনিয়ন ফিফপ্রো এবং স্বনামধন্য আমেরিকান কলেজ অফ স্পোর্টস মেডিসিন আগে থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে।
এই নির্দেশিকায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো স্থানে তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেই খেলোয়াড়দের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে ম্যাচ স্থগিত করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য ডার্টমাউথ কলেজের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক রায়ান ক্যালসবেক এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান, যখন পরিবেশের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তখন বাতাসে উপস্থিত আর্দ্রতার কারণে মানবদেহ প্রাকৃতিকভাবে ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা করার জন্মগত ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলে।
এমন এক অস্বস্তিকর ও ভয়াবহ অবস্থায় মাঠে তীব্র দৌড়ঝাঁপ করা যেকোনো অ্যাথলেটদের জন্য হিট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত জীবনঝুঁকি তৈরি করে। হিট স্ট্রোকের ফলে একজন খেলোয়াড় মাঠেই জ্ঞান হারাতে পারেন, এমনকি তার জীবনে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতিও নেমে আসতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি আসলে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অফ কানেকটিকাটের কোরি স্ট্রিংগার ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডগলাস কাসা এক ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, ফিফার নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী ওয়েট-বাল্ব বা আর্দ্র-বাল্ব তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে রেফারির একক ক্ষমতা রয়েছে খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় ম্যাচ স্থগিত করার। কিন্তু এই ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রা এতটাই চরম, ভয়াবহ ও বিপজ্জনক যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বেসিক ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে এই আবহাওয়ায় কালো পতাকা বা ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ সংকেত উত্তোলন করা হয়।
সামরিক বাহিনীতে এই কালো পতাকা সংকেত দেওয়ার সাথে সাথে সতর্কতা হিসেবে সৈন্যদের সমস্ত ধরনের শারীরিক প্রশিক্ষণ ও বাইরের কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সামরিক বাহিনীর মতো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও কঠোর শারীরিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও যেখানে এমন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, সেখানে পেশাদার ফুটবলারদের টানা নব্বই মিনিট এমন চরম তাপমাত্রায় খেলতে বাধ্য করা কতটা যৌক্তিক ও মানবিক, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে প্রবল সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
খেলোয়াড়দের জীবনের মূল্যের কথা বিবেচনা করে ফিফা শেষ পর্যন্ত এই যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে চূড়ান্ত কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এখন সেদিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে পুরো ক্রীড়াবিশ্ব।