সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিপুল বিনিয়োগেও ব্যর্থতার বৃত্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুই ফুটবল পরাশক্তি

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

বিপুল বিনিয়োগেও ব্যর্থতার বৃত্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুই ফুটবল পরাশক্তি
ছবি : Collected

ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর সৌদি আরব ও কাতার। গত কয়েক দশকে আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশ্বের নামিদামি তারকা ফুটবলারদের নিজেদের ঘরোয়া লিগে নিয়ে আসার পেছনে উভয় দেশই বিনিয়োগ করেছে কোটি কোটি ডলার।

 

কিন্তু চলমান ফিফা বিশ্বকাপে এই বিশাল বিনিয়োগ যে মাঠের ফুটবলে সাফল্যের কোনো নিশ্চিত গ্যারান্টি নয়, তা যেন আবারও প্রমাণিত হলো। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ থাকলেও ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই ধনী রাষ্ট্রকে।

 

সৌদি আরবের জন্য এবারের বিশ্বকাপ ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশটি গ্রুপ ‘এইচ’-এর পয়েন্ট তালিকার তলানিতে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে। তাদের গ্রুপে স্পেইন ও উরুগুয়ের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পাশাপাশি ছিল কেপ ভার্দের মতো ক্ষুদ্র এক রাষ্ট্র, যাদের মোট জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখ।

 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বিস্ময় সৃষ্টি করে কেপ ভার্দে তিন ম্যাচে তিনটি ড্র করে গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের ভরাডুবি এতটাই প্রকট ছিল যে, গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে না পারার সম্পূর্ণ দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ইয়াসের আল-মিশহাল।

 

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার এবং করিম বেনজেমার মতো বৈশ্বিক মেগা তারকাদের নিজেদের ঘরোয়া লিগে যুক্ত করে সৌদি আরব ক্লাব ফুটবলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই ঝকঝকে তারকাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন ঘটেনি।

 

কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করার পর হতাশাব্যঞ্জক পারফরম্যান্সের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছিলেন সৌদি কোচ জর্জিয়াস ডোনিস। তিনি বলেছিলেন, এমন একটি দলের বিপক্ষে তারা খেলেছে যাদের সমপর্যায়ের মনে করা হয়েছিল, কিন্তু মাঠের খেলায় সৌদি ফুটবলাররা তাদের ছন্দ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।

 

এই ফলাফল সৌদি ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ২০২২ বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ কাতারও এবারের আসরে আশানুরূপ পারফরম্যান্স করতে পারেনি। হুলেন লোপেতেগির মতো অভিজ্ঞ ও সফল কোচের অধীনে দল গঠনের পরও তারা গ্রুপ পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় গোল করে বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম পয়েন্ট অর্জনের নজির গড়লেও, সামগ্রিক পারফরম্যান্সে তারা ছিল মলিন। মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশ কাতার ফুটবল কাঠামোর ওপর ব্যাপক বিনিয়োগ করলেও বিশ্বকাপের উত্তেজনাকর মঞ্চে তাদের সেই দাপট দেখা যায়নি।

 

লোপেতেগি অবশ্য ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, কাতার একটি ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফুটবলের প্রতি তাদের বিনিয়োগ ও ভালোবাসা অনেক বড়। প্রতিদিন উন্নতির লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে এই প্রচেষ্টার সুফল আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

 

সৌদি আরব অবশ্য হাল ছাড়ার পাত্র নয়। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া সৌদি দলটি এবারের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে। ২০৩৪ বিশ্বকাপের স্বাগতিক হিসেবে নিজেদের জাতীয় দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থানে দেখতে তারা মরিয়া।

 

তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে খেলাধুলাকে উন্নয়নের হাতিয়ার বানানো সৌদি আরব ক্রীড়া দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চের প্রস্তুতির জন্য প্রতিভা উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ফেডারেশনের অভিজ্ঞ ক্রীড়া পরিচালক ম্যাট ক্রোকারকে প্রতিভা উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব দিয়েছে এবং যুব ফুটবলে বিনিয়োগও দ্বিগুণ করেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ফুটবলের এই ব্যর্থতার চিত্রটি কেবল সৌদি আরব বা কাতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৭৮ সাল থেকে বিশ্বকাপ খেলা ইরান এবং দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে ফেরা ইরাকও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ছাপ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

এমনকি আফ্রিকার ৯টি দল যেখানে নকআউট পর্বে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে ইতিহাস গড়েছে, সেখানে বিপুল অর্থ আর অত্যাধুনিক আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ফুটবলের দুনিয়ায় এখনো বেশ আনকোড়াই রয়ে গেছে।

 

মাঠের ফুটবলে সাফল্য পাওয়ার জন্য কেবল অর্থ বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উন্নত মানসিকতা এবং স্থানীয় প্রতিভা অন্বেষণের মতো বিষয়গুলো যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এবারের বিশ্বকাপের ফলাফল আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে।