মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মেসিকে থামানোর হুংকার ইংল্যান্ডের

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মেসিকে থামানোর হুংকার ইংল্যান্ডের
ছবি: সংগৃহীত

চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের অপেক্ষায় বিশ্ববাসী। আগামী বুধবার আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।

 

ঐতিহাসিক এই লড়াইকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্বে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। মাঠের লড়াইয়ের আগে শুরু হয়ে গেছে কথার লড়াই ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। বিশেষ করে ইংল্যান্ড শিবিরের সাবেক তারকারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ ও মন্তব্য করে চলেছেন।

 

আটলান্টার এই মহারণে আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসিকে কীভাবে আটকানো যায়, সেটিই এখন ইংলিশদের প্রধান চিন্তার বিষয়। তবে ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ফুটবলার জো কোল বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানিয়েছেন যে, মেসিকে নিষ্ক্রিয় করার অব্যর্থ মন্ত্র তাদের জানা আছে।

 

সম্প্রতি নেটফ্লিক্স স্পোর্টসের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আসন্ন সেমিফাইনাল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাবেক তিন তারকা গ্যারি লিনেকার, অ্যালান শিয়েরার এবং মাইকা রিচার্ডস। তাদের প্রাণবন্ত আলোচনার এক পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রসঙ্গ ওঠে লিওনেল মেসিকে নিয়ে।

 

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিশম্যাটিক এই আর্জেন্টাইন অধিনায়কের পারফরম্যান্স কেমন হতে পারে এবং তাকে থামানোর উপায় কী, সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে চেলসি ও লিভারপুলের সাবেক মিডফিল্ডার জো কোল অত্যন্ত জোরালো ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন।

 

তিনি বলেন, ইংল্যান্ডকে ফাইনালে যেতে হলে মেসিকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখতে হবে। রূপক অর্থে তিনি বলেন যে, মেসিকে তাদের ‘ঘুম পাড়িয়ে’ দিতে হবে। কোলের ভাষায়, তারা এই কাজটি অত্যন্ত সফলভাবে করতে যাচ্ছেন এবং এ বিষয়ে তিনি শতভাগ নিশ্চিত।

 

তবে জো কোলের এই অতি আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাকি ফুটবল বিশ্লেষকরা তাৎক্ষণিকভাবে খুব একটা সায় দিতে পারেননি। তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন শঙ্কা কাজ করছিল। রোজারিওর জাদুকর মেসি যদি সেমিফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে নিজের চেনা ছন্দে ফিরে আসেন এবং জাদুকরী কোনো মুহূর্ত তৈরি করে বসেন, তবে মুহূর্তের মধ্যেই সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।

 

তাই শিয়েরার ও লিনেকাররা কোলকে সতর্ক করে বলেন যে, এমন একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এমন বড় কথা বলা মোটেও ঠিক নয়। তাদের মতে, আসর শেষ হওয়ার পর এই ধরনের মন্তব্য করা বেশি যৌক্তিক হতো। কিন্তু জো কোল নিজের অবস্থানে সম্পূর্ণ অনড় ছিলেন।

 

তিনি দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পুনরুক্তি করে বলেন যে, তিনি এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারেন ইংল্যান্ডই এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে। একই অনুষ্ঠানে মাইকা রিচার্ডস আসন্ন ম্যাচের কৌশলগত দিক নিয়ে বিশদ কথা বলেন।

 

তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন যে, আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করাটা ইংল্যান্ডের জন্য মোটেও সহজ কোনো কাজ হবে না। এর জন্য ইংলিশ ফুটবলারদের নিজেদের সামর্থ্যের চেয়েও অনেক বেশি ঘাম ঝরাতে হবে। রিচার্ডসের মতে, আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা মাঠে অত্যন্ত ধূর্ত এবং তাদের মধ্যে সব সময় এক ধরনের হার না মানা বিজয়ী মানসিকতা কাজ করে।

 

তবে তিনি ইংল্যান্ডের বর্তমান কোচ টমাস টুখেলের দলের শক্তির জায়গাও তুলে ধরেন। রিচার্ডস মনে করেন, আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় কৌশলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো যথেষ্ট গতি ও তারুণ্য বর্তমান ইংল্যান্ড দলে রয়েছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, নিজেদের গতির সুবিধা শতভাগ কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ড এই সেমিফাইনালে জয় ছিনিয়ে আনবে।

 

মজার ব্যাপার হলো, লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে জো কোলের এমন কঠোর মন্তব্য ফুটবল ভক্তদের কিছুটা অবাক করেছে। কারণ অতীতে এই জো কোলই একাধিকবার প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

 

এমনকি সময়ের আরেক সেরা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চেয়েও মেসিকে তিনি অনেক এগিয়ে রেখেছিলেন। বিশ্বকাপের আগে কোল একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, রোনালদো হয়তো রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় আক্ষেপ করে ভাবেন যে তিনি যদি মেসির মতো এত ভালো খেলতে পারতেন।

 

কোলের মতে, মেসিই একমাত্র ফুটবলার যিনি ফুটবল দুনিয়ার সম্ভাব্য সবকিছু অর্জন করেছেন এবং একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। সেই চিরচেনা মেসির বিপক্ষেই এখন এমন হুংকার কোলের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েরই একটি কৌশলগত অংশ বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।

 

অন্যদিকে, এই ঐতিহাসিক ম্যাচকে সামনে রেখে আরেক ব্রিটিশ ফুটবল বিশ্লেষক ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় গ্যারি নেভিলও মন্তব্য করেছেন। তিনি অবশ্য মেসির সমালোচনা না করে সরাসরি আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ নিয়ে কথা বলেছেন।

 

বিশেষ করে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং লিসান্দ্রো মার্টিনেজ জুটিকে নিয়ে তিনি এক চমৎকার বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছেন। নেভিল এই জুটিকে বিশ্বের ‘সেরা-বাজে’ সেন্ট্রাল ব্যাক জুটি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, মাঝে মাঝে এই জুটিকে দেখে মনে হয় তারা যেকোনো মুহূর্তে হাস্যকর ভুল করে প্রতিপক্ষকে গোল উপহার দিয়ে বসবে।

 

কিন্তু পরক্ষণেই দেখা যায় তারা দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে অসাধারণ সব ট্যাকল করছে, প্রতিটি হেডার জিতে নিচ্ছে এবং মাঠের সব জায়গায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। নেভিলের মতে, যখনই তারা আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জাতীয় জার্সি গায়ে জড়ায়, তখন তাদের মধ্যে অন্যরকম এক অবিশ্বাস্য শক্তির সঞ্চার হয়, যা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই দারুণ ভীতিকর।

 

সব মিলিয়ে আটলান্টার এই মেগা সেমিফাইনাল কেবল দুটি শক্তিশালী দলের লড়াই নয়, বরং এটি কৌশল, গতি ও স্নায়ুর এক চূড়ান্ত পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। একদিকে মেসির জাদুকরী ফুটবল ও আর্জেন্টিনার লড়াকু মানসিকতা, অন্যদিকে টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ডের গতিশীল ও আক্রমণাত্মক ছক।

 

এখন বিশ্ববাসীর কেবলই দেখার বিষয়, জো কোলের সেই আত্মবিশ্বাস বাস্তবে রূপ নেয়, নাকি লিওনেল মেসি আরও একবার তার জাদুতে বিশ্বকে মোহাবিষ্ট করে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালে নিয়ে যান।