মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলমান বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তের রূপকথায় স্পেনের ত্রাতা মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

চলমান বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তের রূপকথায় স্পেনের ত্রাতা মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ফুটবলের মহোৎসব চলমান বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে স্পেনের একের পর এক নাটকীয় জয় বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের রোমাঞ্চিত করছে। ম্যাচের নির্ধারিত সময় যখন শেষের দিকে, রেফারির শেষ বাঁশি বাজানোর প্রস্তুতি এবং গ্যালারিতে যখন টানটান উত্তেজনা, ঠিক তখনই স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের তুরুপের তাস হয়ে আবির্ভূত হচ্ছেন মিকেল মেরিনো।

 

চলতি বিশ্বমঞ্চের নকআউট পর্বের শেষ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য ও মহামূল্যবান গোলে জয় নিশ্চিত করেছে ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফুটবল বিশ্বে তিনি এখন পরিচিতি লাভ করেছেন স্পেনের ‘ম্যাজিক ম্যান’ হিসেবে, যিনি মাঠের রণকৌশল বদলে দিতে পারেন মাত্র কয়েক মুহূর্তের জাদুতে।

 

চলমান টুর্নামেন্টের শেষ ষোলোর অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে স্পেনের জয়সূচক একমাত্র গোলটি এসেছিল এই তারকার পা থেকেই। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালের মহারণে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলের নাটকীয় জয়েও ‘লা রোজা’দের প্রধান ত্রাণকর্তা ছিলেন তিনি।

 

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই তিনি প্রথম একাদশে ছিলেন না, বরং মাঠের সবুজ ঘাসে কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যথাক্রমে মাত্র পাঁচ ও চার মিনিট। একজন ফুটবলারের জন্য এত অল্প সময়ের মধ্যে ম্যাচের ভাগ্য সম্পূর্ণ নিজেদের অনুকূলে ফিরিয়ে আনা কেবল অবিশ্বাস্যই নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেও বেশ বিরল।

 

বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে দলের ভাগ্য এভাবে বদলে দেওয়ার দক্ষতার কারণে ফুটবল বিশ্বে এখন তাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক চুলচেরা বিশ্লেষণ। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত তিন মৌসুমে স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল সোসিয়েদাদ এবং ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালের হয়ে ঘরোয়া লিগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চ মিলিয়ে ম্যাচের ৮০ মিনিটের পর ১২টি গোল করেছেন এই প্রতিভাবান মিডফিল্ডার।

 

আধুনিক ফুটবলে মোট গোলের হিসেবে হয়তো স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনের রেকর্ড ২৮ গোল কিংবা কিলিয়ান এমবাপের ২৬ গোলের চেয়ে মেরিনো কিছুটা পিছিয়ে আছেন, তবে একজন নিখাদ মিডফিল্ডারের জন্য ম্যাচের শেষভাগে এসে গোল করার এই পরিসংখ্যান যেকোনো ফুটবল বিশেষজ্ঞকে চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

 

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ম্যাচের ৮০ মিনিটের পর করা মেরিনোর ১২টি গোলের মধ্যে ৮টি গোলই সরাসরি ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই গোলগুলো হয় পিছিয়ে থাকা দলকে সমতায় ফিরিয়েছে, নয়তো এনে দিয়েছে নিশ্চিত জয়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচেও মেরিনোর সেই চিরচেনা রূপ আরও একবার প্রত্যক্ষ করেছে ফুটবল বিশ্ব।

 

একজন দক্ষ ‘সুপার-সাব’ হিসেবে মাঠে প্রবেশ করে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তিনি আরও একটি ফুটবল রূপকথা রচনা করেন। ম্যাচের শেষভাগে এসে গোল করার হারের দিক থেকে তিনি হ্যারি কেইনের ৩৬ শতাংশের রেকর্ডের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছেন, যেখানে মেরিনোর ব্যক্তিগত শতকরা হার ৭৫ শতাংশ।

 

ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক উভয় ফুটবলেই মেরিনো তার এই দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে আসছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। গত সেপ্টেম্বরে নিউক্যাসলের বিপক্ষে গানার্সদের ২-১ ব্যবধানের জয় এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেস্টার সিটির বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে তার অসামান্য অবদান ছিল।

 

তবে স্পেনের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল গেঁথে থাকবে ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনালের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি। সেই ম্যাচে শক্তিশালী জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ১১৯তম মিনিটে করা তার দুর্দান্ত ও চোখ ধাঁধানো গোলেই ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে সেমিফাইনালে পা রেখেছিল স্পেন।

 

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে মায়োর্কার বিপক্ষে ৯৩ মিনিটে গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে জয়ী করেছিলেন মেরিনো। একই বছর স্পেনের জার্সিতে জার্মানির বিপক্ষে ১১৯ মিনিটে গোল করেন তিনি।

 

২০২৫ সালে আর্সেনালের হয়ে লেস্টারের বিপক্ষে ৮৭ মিনিটে, স্পেনের হয়ে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৯৩ মিনিটে, এবং আর্সেনালের হয়ে নিউক্যাসলের বিপক্ষে ৮৪ মিনিটে গোল করার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তিনি।

 

এমনকি ২০২৬ সালে আর্সেনালের হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ৮৪ মিনিটে এবং চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে পর্তুগালের বিপক্ষে ৯১ ও ৮৮ মিনিটে তার গোলগুলো দলের জয়ে ভূমিকা রাখে।

 

মিকেল মেরিনোর সমগ্র ক্যারিয়ারের মোট ৩৫টি গোলের মধ্যে ১২টি গোলই এসেছে ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে। শতাংশের হিসেবে তিনি তার মোট গোলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থাৎ ৩৪.৩ শতাংশ গোলই সম্পন্ন করেছেন ঘড়ির কাঁটায় ম্যাচের ৮০ মিনিট পার হওয়ার পর।

 

ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলছেন এবং কমপক্ষে ৩০টি গোল করেছেন-এমন বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের তালিকা তৈরি করলে শেষ মুহূর্তে গোল করার হারের দিক থেকে মেরিনো বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী।

 

আজ ফুটবল পরাশক্তি ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মেগা দ্বৈরথেও স্পেনের রণকৌশলে এবং দলের ভাগ্য নির্ধারণে এই জাদুকরী মিডফিল্ডারের পারফরম্যান্স একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।