মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেমিফাইনালে আজ মুখোমুখি স্পেন ও ফ্রান্স, পরিসংখ্যানে কার কেমন অতীত ইতিহাস

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

সেমিফাইনালে আজ মুখোমুখি স্পেন ও ফ্রান্স, পরিসংখ্যানে কার কেমন অতীত ইতিহাস
ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ফিফা বিশ্বকাপের চলমান মহাযজ্ঞ এখন তার চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ রাতে এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের অন্যতম দুই পরাশক্তি ফ্রান্স এবং স্পেন।

 

বিশ্ব ফুটবলের এই মেগা লড়াইকে কেন্দ্র করে টেক্সাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ সময় আজ দিবাগত রাত একটায় মাঠে গড়াতে যাওয়া এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি কেবল দুটি দলের লড়াই নয়, বরং এটি ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের এক চূড়ান্ত মহারণ।

 

ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের দিকে, যেখানে বর্তমান সময়ের সেরা তারকারা নিজেদের ফুটবলীয় নৈপুণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি অতীত পরিসংখ্যানের পাতা থেকেও প্রেরণা খুঁজবেন।

 

আন্তর্জাতিক ফুটবল মঞ্চে, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো আসরে ফ্রান্স বরাবরই একটি অত্যন্ত সফল ও শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০২৬ সালের বর্তমান এই রোমাঞ্চকর টুর্নামেন্ট নিয়ে ফরাসিরা তাদের সুদীর্ঘ ফুটবল ইতিহাসে মোট আটবার সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার অসামান্য কীর্তি গড়েছে।

 

তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। এর আগে খেলা সাতটি সেমিফাইনালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের জয়ের পাল্লা কিছুটা ভারী হলেও শুরুর দিককার অভিজ্ঞতাগুলো ছিল ফরাসি ফুটবল সমর্থকদের জন্য চরম হতাশা ও বেদনার।

 

বিশেষ করে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে যখন তারা প্রথমবারের মতো শেষ চারের মঞ্চে পা রেখেছিল, তখন কিংবদন্তি পেলের জাদুকরী পারফরম্যান্সে উদ্দীপ্ত ব্রাজিলের কাছে ৫-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল।

 

এরপর ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে তাদের সেমিফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ও বিতর্কিত লড়াই হিসেবে পরিচিত। সেই ম্যাচে মূল এবং অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে হৃদয়বিদারক পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে হয় ফ্রান্সকে।

 

এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপেও এই একই প্রতিপক্ষ অর্থাৎ পশ্চিম জার্মানির কাছে ২-০ গোলে হেরে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় ফরাসিদের। তবে দীর্ঘ তিন দশকের সেই সীমাহীন আক্ষেপ ও যন্ত্রণার অবসান ঘটে ১৯৯৮ সালে, যখন ফ্রান্স নিজেদের ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়।

 

সেই আসরের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর ব্যবধানে হারিয়ে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের স্বপ্নের ফাইনালে জায়গা করে নেয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের মাটিতেই সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার গৌরব অর্জন করে।

 

১৯৯৮ সালের সেই অবিস্মরণীয় সাফল্যের পর থেকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চে ফ্রান্স যেন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে তারা আবারও ফাইনালে ওঠে।

 

এরপর ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মকে ১-০ গোলে এবং সবশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে চমক জাগানো আফ্রিকান দল মরক্কোকে ২-০ গোলের সুস্পষ্ট ব্যবধানে পরাজিত করে তারা টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালের টিকিট কাটে।

 

আর এবারের ২০২৬ সালের আসরে শেষ চারে জায়গা করে নেওয়ার মাধ্যমে ফরাসিরা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে জার্মানি ও ব্রাজিলের পর মাত্র তৃতীয় দেশ হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলার এক বিরল ও অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

 

অন্যদিকে, ফরাসিদের এই সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে স্পেন। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মঞ্চে স্প্যানিশদের উপস্থিতির পরিসংখ্যান ফ্রান্সের তুলনায় বেশ সীমিত হলেও, টুর্নামেন্টের এই নির্দিষ্ট ধাপে তাদের সাফল্যের হার শতভাগ, যা যেকোনো দলের জন্যই ঈর্ষণীয়।

 

স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, প্রথাগত নকআউট পদ্ধতির সেমিফাইনালে তারা এর আগে কেবল একবারই অংশগ্রহণ করেছে। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অফিশিয়াল সেমিফাইনালে পৌঁছানোর কৃতিত্ব দেখিয়েছিল ‘লা রোজা’ খ্যাত দলটি।

 

ডারবানের সেই ঐতিহাসিক রাতে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী জার্মানি। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেই ম্যাচে স্প্যানিশ কিংবদন্তি ডিফেন্ডার কার্লেস পুয়োলের নেওয়া একটি দুর্দান্ত ও বুলেট গতির হেডারে জার্মানিকে ১-০ ব্যবধানে পরাস্ত করে প্রথমবারের মতো স্বপ্নের ফাইনালে উত্তীর্ণ হয়েছিল স্পেন।

 

সেই আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে পরবর্তীতে ফাইনালে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তারা নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ ট্রফিটি জয় করার অসামান্য গৌরব অর্জন করে।

 

অবশ্য স্পেনের বিশ্বকাপ ইতিহাসের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ, যেখানে তারা টুর্নামেন্ট শেষে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিল। তবে সেই সময়ের টুর্নামেন্টের কাঠামো বর্তমানের মতো ছিল না।

 

সেবার শীর্ষ চার দলকে নিয়ে কোনো প্রথাগত বা সরাসরি নকআউট সেমিফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি, বরং চার দলের একটি ফাইনাল গ্রুপ পর্বের লিগ পদ্ধতিতে শিরোপা নির্ধারিত হয়েছিল। তাই আধুনিক ফুটবলের মানদণ্ডে ২০১০ সালকেই স্পেনের একমাত্র অফিশিয়াল সেমিফাইনাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

আজ টেক্সাসের ঝলমলে আলোয় যখন এই দুই পরাশক্তি একে অপরের মুখোমুখি হবে, তখন একদিকে থাকবে ফ্রান্সের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং টানা তিনবার সেমিফাইনাল খেলার মানসিক দৃঢ়তা, আর অন্যদিকে থাকবে স্পেনের নিখুঁত শতভাগ সাফল্যের অহংকার ও নান্দনিক ফুটবলের ছন্দ। ইউরোপীয় ফুটবলের এই দুই চিরচেনা প্রতিপক্ষের মহারণে শেষ হাসি কে হাসবে, তা জানতে এখন কেবলই সময়ের অপেক্ষা।