শিরোপা ধরে রাখার এই চূড়ান্ত স্বপ্নের পথে তাদের আজকের বাধা শক্তিশালী ইংল্যান্ড। হাই-ভোল্টেজ এই লড়াইয়ে জয়লাভ করতে পারলেই স্বপ্নের ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবেন লিওনেল মেসিরা। বাংলাদেশ সময় আজ দিবাগত রাত একটায় শুরু হতে যাওয়া এই মহারণ ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মধ্যে উত্তেজনার পারদ এখন চরমে।
ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ফুটবলীয় দর্শনের এই লড়াই কেবল একটি সাধারণ ম্যাচ নয়, বরং এটি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনার অপেক্ষা। কাতার বিশ্বকাপের মুকুট জয়ী লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা এবারের আসরেও শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন।
ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন কেন তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের অন্যতম কঠিন প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তিন-এক গোলের ব্যবধানে এক দাপুটে জয় ছিনিয়ে এনে তারা শেষ চারের এই মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ নিশ্চিত করেছে।
তবে সেমিফাইনালের এই লড়াই মোটেও সহজ হবে না বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা। কারণ প্রতিপক্ষ হিসেবে জার্মান মাস্টারমাইন্ড থমাস টুখেলের অধীনে থাকা ইংল্যান্ড দল অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং কৌশলগত দিক থেকে দারুণ শক্তিশালী।
টুখেলের অধীনে ইংলিশরা রক্ষণভাগে যেমন নিশ্ছিদ্র, তেমনি আক্রমণভাগেও অত্যন্ত ক্ষিপ্র। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলের শুরুর একাদশ কেমন হবে, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকদের মধ্যে চলছে নানা জল্পনাকল্পনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সেমিফাইনালের মতো এমন চাপযুক্ত ও স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচের শুরুর একাদশ নিয়ে এখনই পুরোপুরি তাসের ঘর খুলতে নারাজ চিন্তাশীল আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। ম্যাচ পূর্ববর্তী আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দলের রণকৌশল নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের অত্যন্ত সাবলীল অথচ রহস্যময় উত্তর দেন।
সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, থমাস টুখেলের শক্তিশালী ইংল্যান্ড দলের খেলার ধরনকে মাথায় রেখে নিজেদের কৌশলগত জায়গায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা অত্যন্ত গভীরভাবে বিবেচনা করে দলে কিছু প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হতে পারে।
তাদের মূল লক্ষ্য হলো মাঠের পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই এবং নিজেদের সেরা একাদশটিই মাঠে নামানো। একই সঙ্গে দলের সব খেলোয়াড় শারীরিক ও মানসিকভাবে দারুণ ছন্দে আছেন বলেও তিনি গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করেন।
কোচের সুনির্দিষ্ট কোনো নাম প্রকাশ না করলেও দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও অনুশীলনের ধরন থেকে একাদশের একটি রূপরেখার আভাস পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোয়ার্টার ফাইনালে সুইসদের হারানো সফল একাদশ থেকে খুব বেশি ওলটপালট হয়তো করা হবে না।
তবে মাঝমাঠে একটি বড় ধরনের চমক দেখার সম্ভাবনা প্রবল। দলের মাঝমাঠের অন্যতম বিশ্বস্ত, পরিশ্রমী ও ‘অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে পরিচিত রদ্রিগো ডি পল আজ শুরুর একাদশে তার চিরচেনা জায়গাটি হারাতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে।
মূলত সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে নিজের সেরা ফর্মে না থাকার কারণে তাকে মাঝপথেই মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে যদি শেষ পর্যন্ত ডি পলকে বেঞ্চে রাখা হয়, তবে তার জায়গায় স্কালোনির প্রথম পছন্দ হিসেবে মাঠে নামতে পারেন নিকোলাস গঞ্জালেজ অথবা তরুণ প্রতিভাবান হুলিয়ানো সিমিওনে।
কৌশলগত দিক বিবেচনা করলে, নিকোলাস গঞ্জালেজ যদি একাদশে সুযোগ পান, তবে তিনি সাধারণত দলের বাম প্রান্তে আক্রমণ শানানোর দায়িত্ব পালন করবেন। তার গতি ও ড্রিবলিং ইংলিশ রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে স্প্যানিশ ক্লাব অ্যাটলেতিকো মাদ্রিদে খেলা হুলিয়ানো সিমিওনেকে খেলানো হলে সেটি হবে স্কালোনির পক্ষ থেকে বেশ চমকপ্রদ একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ, চলতি বিশ্বকাপের আসরে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি ম্যাচেই তিনি শুরুর একাদশে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন।
এই তরুণের অন্তর্ভুক্তি দলের খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এছাড়া রক্ষণভাগের ডান প্রান্তে অর্থাৎ রাইট-ব্যাক পজিশনে গঞ্জালো মন্তিয়েলের চেয়ে শারীরিক সক্ষমতা ও গতির কারণে নাহুয়েল মলিনা কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য শুরুর একাদশের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ইতোমধ্যে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে। গোলবারের নিচে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে যথারীতি অবিচল থাকছেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
রক্ষণভাগের দুর্ভেদ্য দেয়াল সামলাতে তার সামনে মূল ভরসা হয়ে দাঁড়াবেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো এবং লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। তাদের সঙ্গে দুই প্রান্তে ওভারল্যাপ ও রক্ষণের ভারসাম্য বজায় রাখবেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো এবং নাহুয়েল মলিনা, তবে মলিনার বদলে গঞ্জালো মন্তিয়েলকেও দেখা যেতে পারে।
মাঝমাঠের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার গুরুদায়িত্ব বর্তাবে লিয়ান্দ্রো পারেদেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এঞ্জো ফার্নান্দেজের ওপর। চমক হিসেবে তাদের সাথে মাঝমাঠ ও উইংয়ের সংযোগ ঘটাতে যুক্ত হতে পারেন হুলিয়ানো সিমিওনে অথবা নিকোলাস গঞ্জালেজ।
আর আক্রমণভাগের চূড়ান্ত নেতৃত্ব যথারীতি থাকবে জাদুকরী অধিনায়ক লিওনেল মেসি এবং ক্ষিপ্রগতির স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজের কাঁধে। সব মিলিয়ে কৌশল, গতি আর শক্তির এই অসাধারণ লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে, তা দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।