পরিসংখ্যান বলছে, চলতি আসরে তার মাঠে হাঁটার পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দ্রুতবেগে দৌড়ানোর মাত্রা অনেকটাই কমে এসেছে। শারীরিক এই পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও, অবিশ্বাস্য এক কার্যকরী কৌশল আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আগের চেয়েও অধিক সাফল্যের দেখা পাচ্ছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বয়সকে কেবল একটি সংখ্যায় পরিণত করে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন যে, কেবল শারীরিক ক্ষিপ্রতা নয়, বরং অসাধারণ ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা দিয়েও বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ আসরে লিওনেল মেসি খেলায় প্রভাব বিস্তারের এক অভাবনীয় ও নতুন পথ উন্মোচন করেছেন।
মাঠে নিজের মোট কাটানো সময়ের প্রায় অর্ধেকটা অংশ কেবল হেঁটেই তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বোকা বানাচ্ছেন, যা পুরো ফুটবল বিশ্বকে চরমভাবে বিস্মিত করেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল মহারণের আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রকাশিত এক বিস্তারিত পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, কীভাবে ৩৯ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন অধিনায়ক নিজের খেলার দীর্ঘদিনের চেনা ধরনকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন।
মূলত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ণায়ক মুহূর্তগুলোর জন্য নিজের মহামূল্যবান শারীরিক শক্তি সঞ্চয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি এই অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছেন। বিবিসির তথ্য অনুসারে, চলতি বিশ্বকাপে মেসি তার অতিক্রম করা মোট দূরত্বের ৪৭ শতাংশই হেঁটে পার করেছেন, যা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী গোলরক্ষক ব্যতীত মাঠের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
শারীরিক সামর্থ্যের এই স্বাভাবিক পড়তিকে হার না মেনে বরং নিজের খেলাকে আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। পরিসংখ্যান বলছে, এখন প্রতি নব্বই মিনিটের ম্যাচে মেসি গড়ে আট দশমিক দুই কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেন এবং প্রতি ম্যাচে গড়ে মাত্র দুটি দশমিক সাতবার দ্রুতবেগে দৌড় সম্পন্ন করেন।
উল্লেখ্য, গত কাতার বিশ্বকাপেও তার দ্রুতবেগে দৌড়ানোর পরিমাণ ছিল পাঁচ দশমিক তিনবার। তবে দৌড়ের এই পরিসংখ্যান কমলেও মাঠে এই মহাতারকার কার্যকারিতা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে।
চলতি আসরে এখন পর্যন্ত মেসি মোট ৩৩টি লক্ষ্যভেদের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং সতীর্থদের জন্য ২১টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী পারফরম্যান্সের পর বিশ্বমঞ্চে এটিই যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ সম্মিলিত সংখ্যা।
অর্থাৎ, দৌড় কমলেও খেলায় মেসির প্রভাব আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়েছে। খেলার গতিপথ এবং মাঠের সার্বিক পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে পড়ার অসাধারণ ক্ষমতাই এখন তার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সাফল্যের এই অভাবনীয় কৌশলে ভর করে চলতি বিশ্বকাপেই টুর্নামেন্টের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার অবিস্মরণীয় রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বমঞ্চে এখন পর্যন্ত তার মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে একুশে।
তার ঠিক পেছনে থাকা ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপে ২০ গোল নিয়ে তাকে তাড়া করলেও, সম্প্রতি স্পেনের কাছে হেরে ফ্রান্সের বিদায়ের মধ্য দিয়ে সেই দৌড় আপাতত থেমে গেছে। শুধু তাই নয়, এবারের আসরে এখন পর্যন্ত আটটি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জয়ের লড়াইয়েও যৌথভাবে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন এই জাদুকর।
শক্তি সঞ্চয়ের এই যুগান্তকারী কৌশলটি মূলত মেসির দীর্ঘ ও বর্ণিল ক্যারিয়ারের আরেকটি কৌশলগত বিবর্তন মাত্র। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত গতিময় একজন প্রান্তিক খেলোয়াড়, যিনি চোখের পলকে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতেন।
এরপর পেপ গার্দিওলার অধীনে তিনি ছদ্মবেশী কেন্দ্রীয় আক্রমণভাগের খেলোয়াড় ভূমিকায় বিশ্ব মাতিয়েছেন। আর ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে ক্লাব এবং জাতীয় দলে তিনি অনেকটা মাঝমাঠের গভীর থেকে আক্রমণ রচয়িতার গুরুদায়িত্ব পালন করছেন।
নিজের খেলার ধরনের এই আমূল পরিবর্তন এবং কৌশলগত বিবর্তনের নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক গুরু পেপ গার্দিওলাকে বিশেষ কৃতিত্ব দিয়েছেন লিওনেল মেসি। কৌশলগত পরিপক্বতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি কৌশলগত বিষয়গুলো নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না।
কিন্তু পেপ গার্দিওলার অধীনে খেলার সময় তিনি ফুটবলীয় দর্শনের অনেক গভীর বিষয় আয়ত্ত করেছেন। মাঠের ফাঁকা জায়গা বুঝতে পারা, বলের দখল নিজেদের পায়ে ধরে রাখা এবং সামগ্রিকভাবে ফুটবলের কৌশলগত দিকগুলো কীভাবে কাজ করে, তা তিনি গার্দিওলার কাছেই শিখতে শুরু করেন।
মেসি আরও যুক্ত করেন যে, বর্তমান সময়ের ফুটবল আগের চেয়ে অনেক বেশি বদলে গেছে। খেলার ধরন, পদ্ধতি এবং শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োগ-সবকিছুতেই এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এখনকার ফুটবল অনেক বেশি কৌশলনির্ভর এবং শারীরিক শক্তিনির্ভর।
আগে মাঠে যেমন অনেক বেশি ফাঁকা জায়গা পাওয়া যেত, এখনকার আঁটসাঁট রক্ষণের যুগে তা আর পাওয়া যায় না। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি।
আজ বুধবার দিবাগত রাত একটার সময় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় শেষ চারের এই মহাদ্বৈরথে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এবারের আসরে আর্জেন্টিনার সামনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছোঁয়ার হাতছানি। ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে স্কালোনির শিষ্যরা।
অন্যদিকে, ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে ইংলিশদের সামনেও অপেক্ষা করছে এক পাহাড়সম কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলা সর্বশেষ ১৫টি ম্যাচে একমাত্র পোল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দলই মেসিকে গোল করা বা সতীর্থকে দিয়ে গোল করানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তাই ইংল্যান্ডের জমাট রক্ষণভাগ এই জাদুকরকে কতটা সামলাতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।