বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফাইনালে মুখোমুখি মেসি ও ইয়ামাল, লটারি থেকে জন্ম নেওয়া সেই ঐতিহাসিক ছবির গল্প

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

ফাইনালে মুখোমুখি মেসি ও ইয়ামাল, লটারি থেকে জন্ম নেওয়া সেই ঐতিহাসিক ছবির গল্প
ছবি: সংগৃহীত

আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এক শ্বাসরুদ্ধকর ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেমিফাইনাল লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের চূড়ান্ত লড়াইয়ে নিজেদের স্থান পাকা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

 

এর মধ্য দিয়ে ফুটবল বিশ্ব আরও একটি স্বপ্নের লড়াইয়ের নিশ্চয়তা পেয়েছে। আগামী রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্ব ফুটবলের মহামূল্যবান সোনালি ট্রফি জয়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ে ইউরোপের অন্যতম সেরা দল ও সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হবে কোপা আমেরিকাজয়ী শক্তিশালী আর্জেন্টিনা।

 

আসন্ন এই বহুল প্রতীক্ষিত মহারণের আগে পুরো বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন কেবল দুজন মহাতারকার দিকে নিবদ্ধ-লিওনেল মেসি এবং লামিনে ইয়ামাল। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতা, ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসি এবং একই ক্লাবের একাডেমি থেকে উঠে আসা ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল এবারই প্রথমবারের মতো মাঠের লড়াইয়ে একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।

 

তবে বিশ্বমঞ্চে তাদের এই প্রথম সাক্ষাৎ হলেও, ব্যক্তিগতভাবে তাদের দেখা এবারই প্রথম নয়। বরং প্রায় দুই দশক আগে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। ইয়ামাল তখন ছিলেন নিতান্তই এক অবুঝ শিশু, আর মেসি ছিলেন মাত্র ২০ বছর বয়সী এক উদীয়মান ফুটবল প্রতিভা, যিনি বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিলেন।

 

দুই বছর আগে অনুষ্ঠিত ২০২৪ সালের ইউরোপীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে যখন স্পেনের জাতীয় দলের হয়ে ইয়ামাল নিজের অভাবনীয় উত্থান ও প্রতিভার জানান দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু অবিশ্বাস্য ও বিরল ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

 

বর্তমানে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত লড়াইয়ের মতো বিশ্বমঞ্চে তাদের এই ঐতিহাসিক পুনর্মিলনী সেই পুরোনো ছবিগুলোকে আরও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, প্রাসঙ্গিক ও আবেগঘন করে তুলেছে। বহুল আলোচিত সেই ছবিগুলোতে দেখা যায়, পানিভর্তি একটি ছোট্ট পাত্রে বসে আছেন শিশু ইয়ামাল।

 

তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন মা এবং কাঁধ পর্যন্ত চুল নামানো তরুণ লিওনেল মেসি। শিশু ইয়ামালকে পরম যত্নে গোসল করিয়ে দিতে তার মাকে দারুণভাবে সাহায্য করছেন লাজুক স্বভাবের মেসি।

 

এই ঐতিহাসিক ও চমকপ্রদ ছবিটি সর্বপ্রথম জনসমক্ষে আনেন লামিনে ইয়ামালের বাবা। তার ব্যক্তিগত মাধ্যম থেকে পরবর্তীতে ছবিটি ফুটবল বিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য এক সংবাদকর্মীর কাছে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে মুহূর্তের মধ্যেই তা পুরো বিশ্বের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

 

এরপর স্পেনের একটি সুপরিচিত ও শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া দৈনিক দ্বিতীয় আরেকটি ছবি প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, তরুণ মেসি একাই হাস্যোজ্জ্বল ছোট্ট ইয়ামালকে পরম আদরে ধরে বসে আছেন এবং ইয়ামাল তখনও সেই পানির পাত্রেই রয়েছেন।

 

মূলত ২০০৭ সালের শরতে বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামের অতিথি দলের সাজঘরে এই অমূল্য ছবিগুলো তোলা হয়েছিল। কাতালান একটি সংবাদপত্র এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে একটি দাতব্য বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য পেশাদার ও স্বাধীন আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট ছবিগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন।

 

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক এক সংবাদ সংস্থার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলোকচিত্রী মনফোর্ট সেই ছবি তোলার পেছনের গল্পটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। ইউনিসেফের সহায়তায় তারা যখন বর্ষপঞ্জিটি তৈরি করছিলেন, তখন প্রতিষ্ঠানটি স্পেনের মাতারোর রকা ফন্ডা এলাকায় একটি বিশেষ লটারির আয়োজন করেছিল।

 

ঘটনাচক্রে ঠিক সেই এলাকাতেই বসবাস করত ইয়ামালের পরিবার। বার্সেলোনার প্রথম সারির কোনো একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে ছবি তোলার সুবর্ণ সুযোগ পেতে তারা লটারির টিকিট কাটেন এবং ভাগ্যক্রমে বিজয়ী হন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সাজঘরে ইয়ামাল এবং তার মায়ের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি।

 

তবে ছবি তোলার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। মনফোর্ট জানান, মেসি তখন স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত লাজুক ও অন্তর্মুখী ছিলেন। সাজঘরে ঢুকে পানিভর্তি পাত্র এবং তার ভেতর একটি ছোট্ট শিশু দেখে তিনি প্রথমে বুঝতেই পারছিলেন না যে বাচ্চাটিকে কীভাবে সামলাবেন বা কোলে নেবেন।

 

তখন ইয়ামালের মা নিজেই তরুণ ও লাজুক মেসিকে ছবি তোলার কাজে দারুণভাবে সাহায্য করেছিলেন। প্রায় সতেরো বছর পর নিজের তোলা সেই সাধারণ ছবি এভাবে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলায় আলোকচিত্রী মনফোর্ট অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ও রোমাঞ্চিত।

 

সেদিনের সেই কাকতালীয় সাক্ষাতের পর কালের পরিক্রমায় পার হয়ে গেছে দীর্ঘ সময়। লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছেড়েছেন ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ হিসেবে।

 

অন্যদিকে মাত্র পনেরো বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হওয়া ইয়ামাল ইতোমধ্যে স্পেনের হয়ে ইউরোপীয় শিরোপা জয় করেছেন এবং সদ্য উনিশ বছরে পা দিয়ে নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ও প্রতিশ্রুতিশীল তারকা হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

 

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মেসির মুখোমুখি হওয়ার স্বপ্নের কথাও জানিয়েছিলেন ইয়ামাল। তিনি বলেছিলেন, এখন তিনি কিছুটা বড় হয়েছেন এবং মেসিরও বয়স বেড়েছে, তাই চূড়ান্ত লড়াইয়ে তার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাওয়াটা হবে এক বিশাল রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

 

অবশেষে নিয়তি তাদের দুজনকে আবারও এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও ভক্তরা এখন ইয়ামালকে মেসির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে আটবারের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের খেতাবজয়ী ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই কিংবদন্তির অসামান্য কীর্তিকে স্পর্শ করতে তাকে এখনো অনেক দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।

 

আর সেই মহাকাব্যিক পথচলা শুরু করার জন্য বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো বিশ্বমঞ্চে ফুটবল জাদুকর মেসিকে হারানোর চেয়ে বড় ও রাজকীয় মঞ্চ আর কী-ই বা হতে পারে! পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে এই দুই প্রজন্মের অবিশ্বাস্য এক লড়াই দেখার জন্য।