মাঠের লড়াইয়ে তার সেই প্রতিশ্রুতির শতভাগ সত্যতা মিলেছে। আগের যেকোনো আসরের চেয়ে এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে মোট ম্যাচের সংখ্যাও। স্বাভাবিকভাবেই গোল উৎসব আর আয়োজক শহরের সংখ্যাতেও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবারের বিশ্বকাপ।
প্রতিযোগিতার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার রাজস্ব আয়ও। আগামী রোববারের বহুল প্রতীক্ষিত মেগা ফাইনালের আর মাত্র একদিন বাকি রয়েছে। আর এই উপলক্ষে এবারের আসরে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে দেওয়া হচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের রেকর্ড পরিমাণ আর্থিক পুরস্কার বা প্রাইজমানি।
বিশ্বকাপের প্রাইজমানির খুঁটিনাটি এবং চ্যাম্পিয়ন দল কত টাকা পাচ্ছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জনপ্রিয় ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক। গত বছরের ডিসেম্বরেই ফিফা এবারের আসরের জন্য রেকর্ড ৬৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রাইজ ফান্ডের ঘোষণা দিয়েছিল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কাতারে অনুষ্ঠিত গত ২০২২ বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বেশি। আগামী রোববারের শিরোপা নির্ধারণী মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন এবং লাতিন আমেরিকার ফুটবল জাদুকর আর্জেন্টিনা।
এই মেগা ফাইনালের জয়ী দল তথা বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা প্রাইজমানি হিসেবে পাবে ৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬১৬ কোটি টাকারও বেশি। অন্যদিকে রানার্স-আপ দল ঘরে তুলবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা প্রায় ৪০৬ কোটি টাকা।
ফাইনালের এই মহারণের আগে শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। এই ম্যাচে যারা জিতবে, অর্থাৎ তৃতীয় স্থান অধিকারী দল পাবে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যার পরিমাণ প্রায় ৩৫৭ কোটি টাকা। আর পরাজিত দল তথা চতুর্থ স্থান অধিকারী দল পাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৩৩৩ কোটি টাকা।
কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলো, যেমন মরক্কো, বেলজিয়াম, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার করে। এছাড়া শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়া আটটি দলের প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার করে। আর শেষ বত্রিশ থেকে বিদায় নেওয়া ষোলোটি দলের প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার করে।
বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে ফাইনাল পর্যন্ত দীর্ঘ আটত্রিশ দিনের এই লড়াইয়ে অংশ নেওয়া আটচল্লিশটি দলের প্রত্যেকের জন্যই অন্তত ১ কোটি ৫ লাখ ডলার নিশ্চিত করা ছিল। এর মধ্যে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলো পাচ্ছে ৯০ লাখ ডলার এবং সেই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রস্তুতি খরচ বাবদ দেওয়া হচ্ছে আরও ১৫ লাখ ডলার।
ফিফা এই প্রাইজমানির পুরো অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা ফেডারেশনের তহবিলে প্রদান করে থাকে। এরপর সেই ফেডারেশনগুলো নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারণ করে, এই অর্থের কত অংশ খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফদের পারফরম্যান্স বোনাস হিসেবে দেওয়া হবে।
প্রাইজমানির বাকি অংশ সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবলের তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ অবকাঠামো নির্মাণ খাতে ব্যয় করা হয়ে থাকে। ফিফা একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে পরিচিত হলেও, আটচল্লিশ দলের এই বিশাল বিশ্বকাপ থেকে তাদের রেকর্ড এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি রাজস্ব আয়ের প্রক্ষেপণ রয়েছে।
সেই হিসাব অনুযায়ী, মোট আয়ের মাত্র সাড়ে ছয় শতাংশ অর্থ অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রাইজমানি হিসেবে বণ্টন করা হচ্ছে। রাজস্বের এই অভাবনীয় বৃদ্ধি ফিফার চার বছরের চক্রের মোট আয়কে রেকর্ড এক হাজার তিনশো কোটি ডলারে নিয়ে ঠেকাবে। এটি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপসহ আগের চার বছরের চক্রের আয় থেকে অনেক বেশি।
টাকার অঙ্কের এই বিশাল উল্লম্ফন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে চ্যাম্পিয়নদের পুরস্কারের ক্ষেত্রে। কাতারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর এবার চ্যাম্পিয়নরা তাদের চেয়ে আরও ৮০ লাখ ডলার বেশি ঘরে তুলবে। রানার্স-আপ দলও গতবারের রানার্স-আপ ফ্রান্সের চেয়ে ৩০ লাখ ডলার বেশি পাচ্ছে।
ফুটবলের এই সর্বোচ্চ সংস্থা প্রথম জনসমক্ষে প্রাইজমানির হিসাব প্রকাশ করা শুরু করে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে। সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল মাত্র ২২ লাখ ডলার এবং পুরো টুর্নামেন্টের মোট প্রাইজমানিই ছিল মাত্র ২ কোটি ডলার।
চুয়াল্লিশ বছর পর এসে সেই হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে, এবারের চ্যাম্পিয়নরা ১৯৮২ সালের ইতালির চেয়ে প্রায় বিশ গুণেরও বেশি অর্থ পাচ্ছে। রোববারের ফাইনালে বিজয়ী দলের ছাব্বিশ জন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের প্রত্যেকের গলায় উঠবে ঐতিহাসিক সোনার মেডেল।
একইভাবে রানার্স-আপ দল পাবে রুপার মেডেল এবং শনিবারের তৃতীয় স্থান জয়ী দল পাবে ব্রোঞ্জের মেডেল। মেডেল দেওয়ার এই নিয়মে অতীতে বেশ কড়াকড়ি ছিল। ১৯৭৮ সালের আগে কেবল ফাইনালে খেলা মূল এগারোজন খেলোয়াড়কেই মেডেল দেওয়া হতো।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ফিফা এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় পুরোনো নিয়ম সংশোধন করে। দলগত ট্রফি ও মেডেলের পাশাপাশি ফাইনাল শেষে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পুরস্কারও দেওয়া হবে, তবে এই ব্যক্তিগত ট্রফিগুলোর সঙ্গে কোনো বাড়তি অর্থ বা প্রাইজমানি থাকে না।