ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি এই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। রোববার রাজধানী তেহরানে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক ফ্রেডেরিক প্লেইটজেনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, শান্তি আলোচনা দৃশ্যত স্থবির হয়ে পড়লেও মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যেকোনো ধরনের ফলপ্রসূ আলোচনার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হিসেবে তাদের পরিবর্তনশীল লক্ষ্য ও দ্বিমুখী নীতিকে দায়ী করেছেন বাঘায়ি। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পুরো শান্তি প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘায়িত করে তুলেছে।
চলমান এই অচলাবস্থা নিরসনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করে ইরান। তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তির আওতায় শান্তিপূর্ণ প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার যে সার্বভৌম ও আইনগত অধিকার ইরানের রয়েছে, ওয়াশিংটনকে তা নিঃশর্তভাবে মেনে নিতে হবে।
এর পাশাপাশি, বিদেশে আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবিলম্বে ও কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়াই তেহরানকে ফেরত দিতে হবে। বাঘায়ি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ ফেরত দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অনুদান বা ছাড় নয়, বরং এটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের সম্পূর্ণ আইনি ও ন্যায্য অধিকার।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে সংরক্ষিত ইরানের বিপুল পরিমাণ তেল রাজস্ব, বাণিজ্যিক সম্পদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ আটকে রেখেছে।
সম্প্রতি অর্থনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সম্ভাব্য হামলার কারণে মিত্র দেশগুলোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা হবে, তার পুনর্গঠন এবং অতীতের ক্ষতিপূরণ মেটাতে ইরানের এই জব্দকৃত অর্থ ব্যবহারের একটি পরিকল্পনা নিবিড়ভাবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই অন্যায্য খবরের তীব্র সমালোচনা করে ইরানি মুখপাত্র অবিলম্বে সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে অর্থ অবমুক্ত করার জোর আহ্বান জানান। এছাড়া, গত এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর যে আকস্মিক হামলা চালিয়েছে, সেটিকে তিনি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অবিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন বেপরোয়া ও আগ্রাসী নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন বাঘায়ি।
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
এতসব সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। রোববার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি।
এই তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাতে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনির উদ্দেশে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের একটি বিশেষ কূটনৈতিক বার্তা হস্তান্তর করেন, যা চলমান সংকট নিরসনে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।