তাঁর মতে, তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের এই যৌথ সামরিক অভিযানকে কোনোভাবেই ‘ন্যায়সংগত যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই।
শত শত বছর পুরোনো এই যুদ্ধতত্ত্ব বর্তমান আধুনিক যুগের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা এবং মানবিকতার ধারণার সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
পোপ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের চতুর্থ বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে ইতালির রাজধানী রোম থেকে স্পেনের মাদ্রিদগামী একটি ফ্লাইটে অবস্থানকালে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ওই ফ্লাইটে এক সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি সাম্প্রতিক মন্তব্যের বিষয়ে পোপের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটনের এই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে একে ‘ন্যায়সংগত যুদ্ধ’ বা ‘জাস্ট ওয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের চলমান সংঘাতকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যায় কি না-এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাবে পোপ লিও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, সেখানে কোনো ন্যায়সংগত যুদ্ধ নেই।
তিনি বিষয়টির আরও গভীর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ন্যায়সংগত যুদ্ধের তত্ত্বটি বহু শতাব্দী প্রাচীন একটি ধারণা। সেই যুগে বসে মানুষ আজকের দিনের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং এর অকল্পনীয় ধ্বংসক্ষমতার কথা বিন্দুমাত্র কল্পনাও করতে পারত না।
তাই আধুনিক মারণাস্ত্রের যুগে এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ অচল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরুর এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এমন এক সংবেদনশীল সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আদর্শিক মতবিরোধের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই পোপ লিও বারবার অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে যেসব উসকানিমূলক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর ও উত্তেজনাকর করে তুলতে পারে, তিনি ধারাবাহিকভাবে সেগুলোর তীব্র সমালোচনা করে চলেছেন।
উল্লেখ্য, বিশ্বরাজনীতিতে এই দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্বের মধ্যকার বাদানুবাদের সূত্রপাত হয় চলতি বছরের শুরুর দিকে। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছিলেন যে, ইরানে কোনো সভ্যতা অবশিষ্ট থাকবে না।
পোপ লিও ট্রাম্পের এই চরমপন্থি মন্তব্যকে সরাসরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প পোপকে ‘দুর্বল’ এবং ‘পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে অত্যন্ত অদক্ষ’ বলে প্রকাশ্যেই কটাক্ষ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এমন আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জবাবে পোপ লিও অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, তিনি এসব হুমকিতে মোটেও ভীত নন এবং যেকোনো আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন নিজের জোরালো অবস্থান অব্যাহত রাখবেন।
পোপ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যকার এই নজিরবিহীন প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ইতালির রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ইতালির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ট্রাম্পের এহেন অবমাননাকর মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন।
একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় পোপ লিওর অবিচল অবস্থান এবং তাঁর এই সময়োপযোগী সাহসিকতাপূর্ণ আহ্বানের প্রতি তাঁরা নিজেদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।