এই অতর্কিত সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি তেহরান অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের ওপর নতুন করে কোনো আগ্রাসন চালানো হলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস রপ্তানির অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা শনিবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে এক গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই পাল্টা হামলার কথা স্বীকার করে পুরো ঘটনার একটি বিস্তারিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলকে কেন্দ্র করে এই নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে।
স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে চারটি ট্যাংকার পূর্বানুমতি ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছাড়াই ওই আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহার করে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ইরানি নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও তারা তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগোতে থাকে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানি বাহিনী বাধ্য হয়ে একটি ট্যাংকারের ওপর আক্রমণ চালিয়ে সেটির গতিরোধ করে, যার ফলশ্রুতিতে বাধ্য হয়ে বাকি তিনটি জাহাজ পেছনের দিকে ফিরে যায়।
এই ট্যাংকার আটকের ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। রাত দুটোর দিকে কেশম ও সিরি দ্বীপে অবস্থিত আইআরজিসির দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক টেলিযোগাযোগ টাওয়ার লক্ষ্য করে আকস্মিক মার্কিন ড্রোন হামলা চালানো হয়।
এই অতর্কিত ড্রোন হামলার তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেনি তেহরান। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ইরানের অ্যারোস্পেস ফোর্স তাদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিয়ে কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এই প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভীতিকর ও শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেওয়া আইআরজিসির কড়া বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতি একটি দ্ব্যর্থহীন বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ইরান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো আগ্রাসনমূলক বা উসকানিমূলক তৎপরতা পুনরায় ঘটলে তাদের সামরিক জবাব আর কোনোভাবেই সীমিত পরিসরে থাকবে না।
আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়ে যদি বৈশ্বিক জ্বালানি চলাচলের প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে তার সব দায়ভার ও পরিণাম এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোটকেই বহন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মহলের মতে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার এই হুমকি যদি বাস্তবে পরিণত হয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।