শনিবার সকালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই নজিরবিহীন হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই আকস্মিক হামলা একটি মারাত্মক উসকানি এবং এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির একটি সুস্পষ্ট অপচেষ্টা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের একটি বিশদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেন্টকম জানিয়েছে যে ইরানের ছোড়া সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ছয়টিকেই অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
এছাড়া বাকি একটি ক্ষেপণাস্ত্রও তার পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে। এই অতর্কিত হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত বা বড় ধরনের কোনো অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির শিকার হননি বলে সেন্টকম নিশ্চিত করেছে।
এর পাশাপাশি, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধনের যে দাবি ইরান করেছিল, তাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মিথ্যা বলে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড।
সাম্প্রতিক এই নজিরবিহীন উত্তেজনার একটি সুনির্দিষ্ট সামরিক পটভূমি রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, এর আগে হরমুজ প্রণালির দিকে ধেয়ে আসা ইরানের বেশ কয়েকটি আক্রমণাত্মক ড্রোন তারা সফলভাবে ভূপাতিত করেছিল।
একই সঙ্গে কৌশলগত কারণে ইরানের বেশ কিছু রাডার স্থাপনাতেও মার্কিন বাহিনী আকস্মিক হামলা চালিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের এই সামরিক পদক্ষেপের পরপরই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাটি ঘটিয়েছে তেহরান, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে, এই হামলার দায় স্বীকার করে নিজেদের শক্ত অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এই হামলার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, কেশম দ্বীপ এবং গোরুক অঞ্চলে অবস্থিত তাদের গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ টাওয়ারগুলোতে মার্কিন বাহিনী যে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল, মূলত তারই সরাসরি প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশোধ হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত শত্রুপক্ষের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের দাবি অনুযায়ী, তারা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলোতেই এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতি অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড। তারা কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছে যে, ভবিষ্যতে ইরানের ভৌগোলিক সীমানায় কিংবা তাদের জাতীয় স্বার্থের ওপর নতুন করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে, তার অত্যন্ত কঠোর ও বড় ধরনের সামরিক প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
এই সম্ভাব্য পাল্টা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ারও জোরালো হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি।
সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক গভীর সামরিক ও কূটনৈতিক সংকটের কালো ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে, যা পুরো বিশ্বের অর্থনীতির জন্যই এক বড় উদ্বেগের কারণ।