শনিবার, জুন ২০, ২০২৬
৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কৌশলগত ব্যর্থতা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কৌশলগত ব্যর্থতা
ছবি : Collected

দীর্ঘ চার মাসব্যাপী তীব্র সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখায় পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ বিশ্লেষণে এই চুক্তিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

যদিও এই যুদ্ধবিরতি বিশ্বমঞ্চে স্বস্তি এনেছে, তবে এটি একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের জন্য সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের চিত্র উন্মোচিত করেছে।

 

সমালোচক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা মার্কিন প্রশাসনের একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, যার ফলে প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীটি।

 

যুদ্ধের সূচনা পর্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করার এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের জোরালো প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনার মতো কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

 

তবে বাস্তবতার নিরিখে দেখা যাচ্ছে, চার মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পরও ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং মার্কিন প্রশাসনকে তাদের আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে একটি আপসমূলক সমঝোতা মেনে নিতে হয়েছে।

 

আগামী দুই মাস ধরে যে পারমাণবিক আলোচনা চলার কথা রয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির অনুরূপ একটি কাঠামোতেই রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ট্রাম্প নিজেই এই চুক্তিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিল করেছিলেন, অথচ এখন প্রায় একই ধরনের শর্তে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনকে সংলাপে বসতে হচ্ছে।

 

এই সংঘাতের একমাত্র দৃশ্যমান সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে।

 

এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা হ্রাস পাবে এবং বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে। তবে ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি মূলত যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

ইরান এই প্রণালীকে একটি কার্যকর কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অপরিহার্য প্রভাব ও সক্ষমতা সফলভাবে প্রমাণ করেছে।

 

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ এবং চার মাসের যুদ্ধ ইরানকে আর্থিকভাবে পঙ্গু এবং তাদের সামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করলেও, কৌশলগত দিক থেকে তেহরান লাভবান হয়েছে।

 

যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্রদের দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে ইরান যে কোণঠাসা অবস্থায় ছিল, তা থেকে তারা নতুন করে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির মূল মঞ্চে ফিরে এসেছে।

 

অন্যদিকে, অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহারের পরও একক বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, যা ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনকে তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করবে।

 

- নিউ ইয়র্ক টাইমস