আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট এই আকস্মিক সংকট নিরসনে দুই পক্ষের এই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বিশ্বনেতাদের মাঝে একটি বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত হওয়ায় এই অঞ্চলে নতুন করে কোনো বৃহত্তর সংঘাত বা যুদ্ধের আশঙ্কা আপাতত দূরীভূত হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস গতকাল রোববার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই যুগান্তকারী অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
অ্যাক্সিওসকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, আগামী মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। এই কূটনৈতিক আলোচনার মূল ভিত্তি হবে পূর্বে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’।
এই চুক্তিতে উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট পয়েন্টগুলো নিয়েই উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা বিশদ আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে সম্পূর্ণ শান্ত ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ওই মার্কিন কর্মকর্তা আরও নিশ্চিত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখন বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সম্পূর্ণ বাধাহীন ও মুক্তভাবে চলাচল করতে পারছে এবং সেখানে এই মুহূর্তে কোনো প্রকার সামরিক হস্তক্ষেপ বা নিরাপত্তাজনিত হুমকি নেই।
এই আকস্মিক কূটনৈতিক আলোচনার পটভূমিতে রয়েছে গত কয়েকদিনের চরম সামরিক উত্তেজনা ও ভয়াবাহ পরিস্থিতি। এই অভাবনীয় সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে মূলত গত ২৫ জুন, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে। হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথ অতিক্রম করার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অতর্কিত সামরিক হামলা চালায় ইরানের নৌবাহিনী।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী নিখুঁত ও বিধ্বংসী অভিযানের মাধ্যমে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করার প্রধান ডিপো এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার সিস্টেমের ওপর শক্তিশালী হামলা চালায়। এই ঘটনার পর থেকেই মূলত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাত্রা চরম আকার ধারণ করে।
মার্কিন সেন্টকমের ওই অভাবনীয় হামলার পর ইরানও সামরিকভাবে নীরব থাকেনি। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে সেন্টকম এবং ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সবচেয়ে অভিজাত ও প্রভাবশালী শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকে।
সেন্টকমের অতর্কিত হামলার সরাসরি ও তাৎক্ষণিক জবাব দিতে আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে নিজেদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। বিশেষ করে মিত্র দেশ কুয়েত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে তারা ব্যাপক মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করে।
আইআরজিসির এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বগ্রাসী যুদ্ধের ভয়াবহ শঙ্কা তৈরি করেছিল। তবে, চরম উত্তেজনার মাঝেও একটি স্বস্তির বিষয় হলো, ইরানের এই প্রতিশোধমূলক হামলায় কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর কোনো ধরনের ভৌত অবকাঠামোগত বা প্রাণহানির মতো বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে অ্যাক্সিওসকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন ওই মার্কিন কর্মকর্তা।
একই সুর শোনা গেছে কুয়েত এবং বাহরাইনের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকেও। দেশ দুটির সেনাবাহিনী তাদের নিজ নিজ পৃথক ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে আকাশে থাকা অবস্থাতেই সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন গত ২৭ জুন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল প্রেস টিভির মাধ্যমে আইআরজিসি এক অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল। তাদের আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “গত ২৫ জুন ইরানের সার্বভৌম ভূখণ্ডে হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
এর চরম ও ভয়াবহ মূল্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে অচিরেই চোকাতেই হবে। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটিতে আক্ষরিক অর্থেই নরক নেমে আসবে।” আইআরজিসির এই চরম হুমকিমূলক ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিজের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি অত্যন্ত কড়া ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে উল্লেখ করেন, “আমরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ইরানে আমাদের সামরিক অভিযান শুরু করেছিলাম।
কৌশলগত কারণে তা এখন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে, কিন্তু এমন মুহূর্ত যে কোনো সময় আসতে পারে যখন আমরা আর যৌক্তিক বা পরিমিত আচরণ করব না।” তিনি আরও কঠোর ভাষায় চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আর সত্যিই যদি আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে এমন কোনো মুহূর্ত আসে, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, পৃথিবীর মানচিত্রে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরান’ নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ব আর অবশিষ্ট থাকবে না।”
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সূত্র মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই চরম সময়োচিত ও কঠোর বার্তার পরপরই মূলত ইরান দৃশ্যত সংঘাত থেকে পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসতে সম্মতি জ্ঞাপন করে। এর মধ্য দিয়েই দুই দেশের মধ্যে চলমান এই সাময়িক যুদ্ধের কালো মেঘ সম্পূর্ণ কেটে যায় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসে।