রোববার গভীর রাতে চালানো অতর্কিত এই সামরিক অভিযান সদ্য প্রতিষ্ঠিত ভঙ্গুর শান্তিচুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ওই অঞ্চলে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক বিশেষ যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
শীর্ষ এই দুই নেতার দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয় যে, আইডিএফের নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে ধ্বংস করা ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি ছিল মূলত ৬৫৬ ফুট দীর্ঘ একটি সুবিশাল ও সুরক্ষিত সুড়ঙ্গ।
দক্ষিণ লেবাননের মাজদাল জৌন নামক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরে অবস্থিত এই সুড়ঙ্গটিকে হিজবুল্লাহ তাদের অন্যতম প্রধান সামরিক ঘাঁটি এবং গোপন অস্ত্রের ডিপো হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যবহার করে আসছিল।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, সুপরিকল্পিত এই সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই গোপন সুড়ঙ্গটি থেকে শত শত অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং রকেট লঞ্চার সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় জব্দ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই অভিযানটিকে তাদের জাতীয় ও সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়া এই ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযানটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সংঘটিত হলো, যার মাত্র দুদিন আগে গত ২৭ জুন শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ও দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ইসরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
বিশ্বনেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান শর্ত ছিল- দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকা থেকে ইসরায়েল অবিলম্বে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেবে এবং সেই শূন্যস্থান পূরণে সেখানে লেবানিজ সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত সেনাদের আনুষ্ঠানিকভাবে মোতায়েন করা হবে।
এর মাধ্যমে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিস্থিতির একটি শান্তিপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে, সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই চুক্তির একটি বিশেষ শর্ত বা উপধারায় এ কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল যে, লজিস্টিক সমর্থন ও পর্যায়ক্রমিক নিরাপত্তা হস্তান্তরের স্বার্থে আরও কিছুদিন সীমান্তের লেবানন অংশে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সীমিত উপস্থিতি বজায় থাকবে।
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, চুক্তির এই নির্দিষ্ট শর্তটির সুযোগ নিয়েই গতকাল রোববার রাতের অন্ধকারে লেবাননের সার্বভৌম ভূখণ্ডে আইডিএফ এই ব্যাপক অভিযানটি পরিচালনা করেছে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই এ ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের ঘটনা নজিরবিহীন এবং এটি নিঃসন্দেহে যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়ার পরিপন্থী একটি পদক্ষেপ।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি বাহিনীর এই গভীর রাতের অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আসার পর আজ সোমবার ভোরের দিকে এক জরুরি বিবৃতি প্রকাশ করে এই অতর্কিত হামলার তীব্র নিন্দা ও কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।
গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, দক্ষিণ লেবাননের মাজদাল জৌন শহরে আইডিএফের এই পরিকল্পিত সামরিক অভিযান সদ্য স্বাক্ষরিত ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি অত্যন্ত ‘প্রকাশ্য’ ও নির্লজ্জ লঙ্ঘন।
হিজবুল্লাহর বর্তমান শীর্ষ নেতা নাইম কাসেম উদ্ভূত এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই তথাকথিত সীমান্ত নিরাপত্তা চুক্তিটিকে কার্যত একটি ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা লেবাননের সার্বভৌম স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে তিনি মনে করেন।
একই সাথে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নাইম কাসেম অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছেন, "মাতৃভূমি লেবানন এবং এই দেশের স্বাধীনচেতা লেবানিজ জনগণকে যেকোনো আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার পূর্ণ আইনি, নৈতিক ও ঐতিহাসিক অধিকার হিজবুল্লাহর রয়েছে এবং নিজেদের সেই পবিত্র দায়িত্ব পালন থেকে হিজবুল্লাহ কোনো অবস্থাতেই একচুলও পিছু হটবে না।"
তার এই কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তার পর ওই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তা ও গভীর শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, মাজদাল জৌন শহরের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা কতটা জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এখন এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে কী ধরনের কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, বিশ্বের নজর এখন সেদিকেই নিবদ্ধ।