সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক বিচার দাবি করলেন মোজতবা খামেনি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক বিচার দাবি করলেন মোজতবা খামেনি
ছবি : File Photo

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি তাঁর দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিচালিত কথিত সামরিক আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক বিচারের জোর দাবি জানিয়েছেন।

 

বিচার বিভাগ সপ্তাহ এবং আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ বেহেশতি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের নিহত হওয়ার বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি এই আহ্বান জানান। মোজতবা খামেনি ইরানের বিচার বিভাগের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন যেন গত বছর থেকে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাতে যে অসংখ্য ইরানি নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তার আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা হয়।

 

তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধী এবং আগ্রাসী শক্তিগুলোর দ্বারা সংঘটিত এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আইনানুগ সুরাহা করা বিচার বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার পাশাপাশি বিদেশি শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সামষ্টিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিচার ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

 

সর্বোচ্চ নেতা তাঁর বার্তায় বিগত ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জোড়া সামরিক আগ্রাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, দক্ষিণ ইরানের মিনাব ও লামের্দ শহরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ও প্রবীণ নাগরিকদের হত্যা, হাসপাতাল ও জনসেবামূলক স্থাপনায় হামলা এবং ব্যাপক শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি অসংখ্য আন্তর্জাতিক মামলার শক্ত ভিত্তি হতে পারে।

 

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় এসব যুদ্ধাপরাধের কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। দুর্নীতি দমন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আগ্রাসী শক্তির অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

খামেনির এই কঠোর বার্তার সমসাময়িক সময়েই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আবারও চরমে পৌঁছেছে। রোববার ভোরে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান অতর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

 

এই হামলার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি সতর্ক করে বলেন, চলমান অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তি লঙ্ঘিত হলে ইরানের নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

 

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এমন এক সময় আসতে পারে যখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর সংযত আচরণ করা সম্ভব হবে না এবং অত্যন্ত সফলভাবে শুরু হওয়া সামরিক পদক্ষেপ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে তারা বাধ্য হবেন। এমনটি ঘটলে পৃথিবীর মানচিত্রে বর্তমান ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থার আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না বলেও তিনি কড়া ভাষায় উল্লেখ করেন।

 

এই পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে, যা লেবাননের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীও ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে বেশ কয়েকটি নজরদারি স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে বলে তেহরান অভিযোগ করেছে। এসব ঘটনার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা সংঘাতের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ১৪ দফার অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে অর্জিত এই চুক্তিটির মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক সংঘাত বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তারা কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে বাধ্য হয়েছে এবং এর ফলে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

তবে কুয়েত ও বাহরাইন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। বাহরাইনের একটি আবাসিক ভবন সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো মার্কিন সেনা বা সাধারণ নাগরিক হতাহত হননি বলে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে।

 

কাতার ও কুয়েত উভয় দেশই তাদের ভূখণ্ডে ইরানের এই বারেবারে চালানো হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে নিজেদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে সকল পক্ষকে অবিলম্বে উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।

 

উত্তপ্ত এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরাকের রাজধানী বাগদাদে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইনের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের প্রভাব খাটাতে হবে।

 

আরাঘচি আরও ঘোষণা করেন যে, আগামী ত্রিশ দিন হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে ইরানের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায় থাকবে এবং সব ধরনের বাধা দূর হওয়ার পরই এই জলপথটি পূর্ণ সক্ষমতায় বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

 

এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো পক্ষের একতরফা হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন। ইরাক উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের বিস্তার চায় না বলে নিশ্চিত করেছে, আর তেহরানও এই সংকটময় মুহূর্তে প্রতিবেশী ইরাকের সরকার ও জনগণের অবিচল সমর্থনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

 

- এক্সপ্রেস ট্রিবিউন