এই যুগান্তকারী চুক্তির ফলে তেহরানের ওপর থেকে তেল এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর নিষেধাজ্ঞাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক অবরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ছয়শত কোটি ডলারের বিশাল আর্থিক তহবিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ কাতারের মধ্যস্থতায় খুব শিগগিরই ইরানের হাতে ফেরত দেওয়া হবে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে ইরানের জন্য একটি বিশাল মাত্রার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের পবিত্র ও ঐতিহ্যবাহী শহর কোম সফরকালে শীর্ষ ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ শোবেইরি জানজানির সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সৌজন্যমূলক সাক্ষাতে মিলিত হন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
সেই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকেই তিনি দেশের অর্থনীতি ও কূটনীতির এই অভাবনীয় ইতিবাচক অগ্রগতির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্টভাবে জানান, কাতারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বর্তমানে ইরানের যে এক হাজার দুইশত কোটি বা বারো বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের অর্থ সংরক্ষিত রয়েছে, সদ্য অবমুক্ত হতে যাওয়া এই ছয়শত কোটি ডলার মূলত তারই একটি প্রথম অংশ।
অবশিষ্ট আটকে থাকা আর্থিক তহবিলগুলোও পর্যায়ক্রমে এবং সম্পূর্ণ বৈধ প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পরবর্তী কূটনৈতিক ও আইনি কার্যক্রম পুরোদমে চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে খুব দ্রুতই এ বিষয়ে আরও ইতিবাচক ও গঠনমূলক খবর দেশবাসীকে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক মহলের চরম চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মুখে ইরানি জনগণের অবিচল ধৈর্য, অটল সাহসিকতা ও অভূতপূর্ব দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ও জোরালো ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত কয়েক বছরে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ ও চৌকস কমান্ডার, সমাজের অভিজাত ব্যক্তিবর্গ এবং এমনকি নিরপরাধ স্কুলশিক্ষার্থীদের ওপরও পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের মতো নির্মম ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
এত বড় বড় অপূরণীয় ক্ষতি এবং নিরবচ্ছিন্ন রক্তপাতের পরও দেশ ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানের আপামর জনসাধারণ, শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী এবং রাষ্ট্রযন্ত্র একতাবদ্ধ হয়ে যেভাবে পাহাড়ের মতো দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল, তা সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন, নানামুখী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ইরানকে অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল করার এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল।
কিন্তু ইরানি জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য, গভীর দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের কাছে তাদের সেই সমস্ত ধ্বংসাত্মক ও আগ্রাসী প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। জনগণ প্রমাণ করেছে যে, কোনো ধরনের বহিঃশত্রুর চাপ বা অবরোধ তাদের মাথা নত করাতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও চলমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে ইরানের প্রেসিডেন্ট তাঁর নীতিনির্ধারণী বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার স্বার্থে এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রবল চাপে পড়ে তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ ইসরায়েলকে এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মেনে নিতে শেষ পর্যন্ত বাধ্য করেছে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
পরাশক্তিগুলোর এই দৃশ্যমান পশ্চাদপসরণ মূলত ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিরোধমূলক কূটনীতি ও সামরিক অবিচলতারই একটি চূড়ান্ত ও সফল ফসল বলে তিনি মনে করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের-এর এক বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে সরকারের এই উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বার্তা ও কূটনৈতিক সাফল্যের খবরটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে কেবল ইরানের অবরুদ্ধ ও কোণঠাসা অর্থনীতিই যে নতুন করে বিপুল প্রাণশক্তি ফিরে পাবে তা নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে ও শক্তির ভারসাম্যে একটি সুদূরপ্রসারী এবং ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হতে পারে।