মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত মেনে চললে ইরানও নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, পেজেশকিয়ান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত মেনে চললে ইরানও নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, পেজেশকিয়ান
ছবি : File Photo

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর অন্যতম হলো মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের আবহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বিবৃতি প্রদান করেছেন।

 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের শর্তাবলি যথাযথভাবে মেনে চলে, তবে ইরানও নিজেদের পক্ষ থেকে দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় তিনি এই দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার এই বার্তা একদিকে যেমন কূটনীতির দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি জাতীয় সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস না করার কঠোর বার্তাও বহন করছে।

 

ইরানের প্রেসিডেন্ট তার বার্তায় দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতির মূল ভিত্তিগুলো তুলে ধরেছেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের নীতি সর্বদা যুক্তিনির্ভর এবং গঠনমূলক। তবে একই সঙ্গে তিনি এই হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

 

প্রয়োজনে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হবে অত্যন্ত দৃঢ়, কঠোর এবং আপসহীন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সমঝোতা কখনোই একতরফা হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, চুক্তির সফলতা নির্ভর করে উভয় পক্ষের সদিচ্ছা ও সমান অংশগ্রহণের ওপর।

 

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে সচেষ্ট হয় এবং সমঝোতা স্মারকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, তবে তেহরানও তাদের কথা রাখবে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত ওয়াশিংটনের কোর্টে বল ঠেলে দিয়েছেন।

 

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো ধরনের অযৌক্তিক হুমকি ও ভিত্তিহীন চাপের মুখে ইরান কখনোই নতি স্বীকার করবে না। তেহরানের মূল অবস্থান হলো সর্বদা যুক্তিবোধ ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

 

তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা দুর্বল। যেকোনো আগ্রাসনের মুখে দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষা করার পূর্ণ প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। তার এই বক্তব্য এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এলো, যখন গত কয়েক দিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ মাত্রায় সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার ফলে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন উভয় পক্ষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশা করেছিল, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটবে এবং ওই অঞ্চলে অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও শান্তি ফিরে আসবে।

 

কিন্তু সেই আশায় আঘাত হেনে গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অতর্কিত বিমান হামলা চালানো হয়। এই হামলাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। মার্কিন বিমান হামলার কড়া জবাব দিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেনি তেহরান।

 

ইরানের সামরিক শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সরাসরি কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে শক্তিশালী হামলা চালায়। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলাকে কোনোভাবেই মেনে নেয়নি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এই ঘটনাকে ১৮ জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কূটনৈতিকভাবে এর প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি সামরিক জবাব দিয়ে ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত।

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলো উভয় পক্ষকেই সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

 

এই অঞ্চল দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের একটি বিশাল অংশের জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুধুমাত্র দুই দেশের অভ্যন্তরীণ বা দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সামরিক শক্তির প্রয়োগ কখনোই স্থায়ী সমাধানের পথ দেখাতে পারে না। বরং, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।

 

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই ভারসাম্যপূর্ণ বিবৃতিটি মূলত সেই কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই ইঙ্গিত করে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান যুদ্ধের বিস্তার চায় না, তবে নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা বদ্ধপরিকর। তার এই বক্তব্যের পর এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর যুক্তরাষ্ট্রের দিকে।

 

তাদের নীতিনির্ধারকরা এই বার্তার কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে ভূরাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি। যদি ওয়াশিংটন পুনরায় চুক্তির প্রতি সম্মান জানিয়ে গঠনমূলক আলোচনায় ফিরে আসে, তবে হয়তো চলমান এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব হবে।

 

- মেহের নিউস