সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সামরিক ক্ষেত্রে তাদের এই নতুন ও অতি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক সমর ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ আগামী দিনের বিশ্ব যুদ্ধকৌশল এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এক ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
সামরিক বিষয়াবলি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ মহাকাশভিত্তিক লেজার অস্ত্র উন্নয়নের এই স্পর্শকাতর তথ্যটি নিশ্চিত করেন।
সরকারের ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি যৌথভাবে যে কয়েকটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ লক্ষ্য হলো মহাকাশ প্রতিরক্ষায় একচ্ছত্র শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা।
এই অসামান্য লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা দেশের সেরা ও চৌকস মেধাবীদের নিয়োগ দিচ্ছেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, বর্তমান বিশ্বে আজ পর্যন্ত অন্য কোনো দেশেরই মহাকাশ থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি হামলা চালানোর মতো পূর্ণাঙ্গ ও প্রমাণিত সক্ষমতা নেই।
আর এই বিশেষ সামরিক সক্ষমতায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে ইসরায়েল সরকার সম্পূর্ণরূপে বদ্ধপরিকর। ইসরায়েলের এই অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই মহাকাশভিত্তিক লেজার প্রযুক্তি যদি সফলভাবে অর্জন করা সম্ভব হয়, তবে তা বৈশ্বিক মানচিত্রে ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানকে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলবে।
বিশেষ করে যেসব চরম বৈরী শত্রুপক্ষের বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও অর্থনৈতিক সম্পদ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এক দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যেকোনো মুহূর্তে বিনা বাধায় আঘাত হানা এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করার মতো সব বিষয়ে ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ অগ্রাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
গত বৃহস্পতিবার দেওয়া এক প্রকাশ্য বক্তব্যে তিনি মহাকাশ থেকে হামলা চালানোর সক্ষমতায় শীর্ষ শক্তি হয়ে ওঠার বিষয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। তবে সর্বশেষ এই ব্রিফিংয়ে প্রথমবারের মতো তিনি সম্পূর্ণ নির্দিষ্টভাবে 'মহাকাশভিত্তিক লেজার' প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সামরিক আগ্রহ ও একই সঙ্গে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে লেজার অস্ত্র তৈরিতে ইসরায়েল আগে থেকেই বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী ও পথিকৃৎ একটি দেশ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তারা ইতোমধ্যে 'আয়রন বিম' নামক একটি অত্যন্ত কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী স্থলভিত্তিক লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে তৈরি করেছে, যা ড্রোন, মর্টার বা স্বল্প পরিসরের রকেট অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম।
এর পাশাপাশি ইসরায়েল আকাশপথেও লেজার প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটির অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'এলবিট' পরিদর্শনের সময় শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র দ্য জেরুজালেম পোস্ট একটি অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক প্রকল্প চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়।
ওই প্রকল্পের মূল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে আধুনিক যুদ্ধবিমান থেকে সরাসরি মহাশূন্যে বা ভূমিতে লেজার নিক্ষেপের সক্ষমতা তৈরি করা, যা আকাশযুদ্ধের চিরাচরিত ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজের এই সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়ের সময় দেওয়া বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা যখন গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন, তখন এটি একেবারেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তিনি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র ইরানের দিকেই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত করছেন।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছর ইরানের সঙ্গে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েল বেশ কয়েকবার মহাকাশযুদ্ধ-সম্পর্কিত ইরানের একাধিক সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনায় অত্যন্ত সুকৌশলে সরাসরি হামলা চালিয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যমতে, এসব স্থাপনার মধ্যে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও ছিল, যেগুলো মূলত মহাকাশে স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহে হামলার সক্ষমতা উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্লেষকদের প্রবল ধারণা, ইরানের এই ক্রমবর্ধমান ও উদীয়মান মহাকাশ সক্ষমতাকে শুরুতেই অঙ্কুরে বিনষ্ট করার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যেই ইসরায়েল নিজেদের মহাকাশভিত্তিক লেজার অস্ত্রের উন্নয়নকে এত দ্রুত ত্বরান্বিত করছে।
তবে আন্তর্জাতিক সমর বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজের একটি নির্দিষ্ট দাবির বিষয়ে জোরালো ভিন্নমত পোষণ করেছেন। অন্য কোনো দেশের মহাকাশে এ ধরনের সক্ষমতা একেবারে নেই-কাটজের এই একচেটিয়া বক্তব্যটি পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ বা সঠিক নয় বলে মনে করেন পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা।
কারণ আধুনিক সামরিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বৈশ্বিক পরাশক্তি রাশিয়া এবং চীন উভয়েই ইতিমধ্যে নিজেদের পুরোনো স্যাটেলাইটে সফলভাবে মিসাইল হামলা চালিয়ে পরীক্ষামূলক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার সক্ষমতা বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করে দেখিয়েছে।
এখন ভূরাজনৈতিক মহলে এটিও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কাটজ কি তার এই হুঁশিয়ারি বক্তব্যের মাধ্যমে রাশিয়া ও চীনকে ইরানের মহাকাশ কর্মসূচি ও অন্যান্য অত্যাধুনিক সামরিক বিষয়ে কারিগরি সহায়তা করা থেকে কৌশলগতভাবে নিরুৎসাহিত করতে চাইছেন কি না।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা জার্নালের প্রতিবেদনের মতে, অত্যাধুনিক স্পেস-লেজার প্রযুক্তি সম্ভাব্যভাবে শত্রুপক্ষের যেকোনো স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহকে মুহূর্তের মধ্যে চিরতরে অকেজো বা পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিতে পারে।
এছাড়া মহাকাশে স্যাটেলাইট ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট অতি বিপজ্জনক ধ্বংসাবশেষগুলোও এই শক্তিশালী উচ্চমাত্রার লেজার রশ্মির মাধ্যমে পুড়িয়ে ফেলা বা ভস্মীভূত করা সম্ভব হতে পারে। আন্তর্জাতিক সামরিক অঙ্গনে এমন জল্পনাও প্রবলভাবে রয়েছে যে, ইসরায়েলের হাতে বর্তমানে মজুত থাকা 'অ্যারো-৩' নামের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমেও শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করার প্রচ্ছন্ন সক্ষমতা তাদের থাকতে পারে।
এই অ্যারো-৩ ব্যবস্থা মূলত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক বাইরে, অর্থাৎ গভীর মহাকাশে থাকা অবস্থায় যেকোনো দ্রুতগামী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। যেহেতু মহাকাশ গবেষণায় রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ বা স্পেস ডেব্রি সফলভাবে মোকাবিলা করার অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই বর্তমান বিশ্বের অনেক অগ্রসর দেশই মহাকাশযুদ্ধের নিত্যনতুন ও জটিল কৌশল উদ্ভাবনে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।
কেবল স্যাটেলাইটের বিরুদ্ধে সরাসরি লেজার ব্যবহারের মধ্যেই দেশগুলো সীমাবদ্ধ নেই; বরং সেগুলোকে সাময়িকভাবে অচল করে দেওয়া, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করা, রেডিও সিগন্যাল জ্যামিং করা অথবা বিশেষ রোবোটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টেনে কক্ষপথ থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়ার মতো অত্যাধুনিক কৌশল নিয়েও নিরন্তর গবেষণা চলছে।
ইসরায়েলের এই নতুন ও চাঞ্চল্যকর ঘোষণা আবারও প্রমাণ করে যে, আগামী দিনের যুদ্ধক্ষেত্র কেবল জল, স্থল বা আকাশসীমাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং অসীম মহাকাশই হয়ে উঠবে পরাশক্তিগুলোর সামরিক আধিপত্য বিস্তারের এক নতুন ও চূড়ান্ত রণক্ষেত্র।