দেশটির নৌবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী এই বিবৃতি প্রদান করেছেন। আঞ্চলিক জলসীমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌপথেও ইরানের নিরবচ্ছিন্ন আধিপত্য, বাণিজ্যিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর যে অনস্বীকার্য ও শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে, মূলত তারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে এই ঘোষণায়।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পার্সটুডে এবং ইরানি ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের নির্ভরযোগ্য সংবাদ সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, নৌবাহিনীর এই সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি যেকোনো সম্ভাব্য বহিঃশত্রুর অপতৎপরতা রুখে দিতে এবং দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি অত্যন্ত শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
এই দৃঢ় ঘোষণার মূল প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ইরানের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচির নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পরিদর্শনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে। একটি অত্যন্ত ভাবগম্ভীর, সংবেদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি নৌবাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরে উপস্থিত হয়ে কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানির সঙ্গে এক বিশেষ, রুদ্ধদ্বার ও কৌশলগত বৈঠকে মিলিত হন।
এই উচ্চপর্যায়ের সফরের অন্যতম আবেগময় অংশ ছিল পবিত্র রমজান যুদ্ধে ঐতিহাসিক ‘দেনা ডেস্ট্রয়ার’-এর শহীদদের অমর স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন। সেখানে তিনি এক আবেগঘন পরিবেশে গভীরভাবে শোক প্রকাশ করেন এবং মাতৃভূমির সুরক্ষায় ও দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে নিজেদের মূল্যবান জীবন উৎসর্গকারী বীর নাবিকদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও অসামান্য বীরত্বের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এছাড়া, তিনি সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিক ও যুগোপযোগী সামরিক সরঞ্জামাদি, অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে ঘুরে দেখেন। সদর দপ্তরে আয়োজিত শীর্ষপর্যায়ের ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিশাল জলসীমায় ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি বৈশ্বিক কূটনীতিতে জাতীয় স্বার্থ অটুট রাখার ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর অতুলনীয় ও কৌশলগত ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি উপস্থিত কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী নৌবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে দেশের নতুন ও তরুণ প্রজন্মের মাঝে নিখাদ দেশপ্রেম জাগ্রত করতে অসীম ত্যাগ, যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ এবং শাহাদাতের মহান সংস্কৃতি অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষণ ও এর ব্যাপক প্রসারের ওপর তিনি গভীরভাবে জোর আরোপ করেন।
একটি স্বাধীন জাতির মূল নৈতিক ভিত্তি ও আত্মরক্ষার অদম্য প্রেরণা যে এই বীর শহীদদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের মাঝেই নিহিত রয়েছে, সেটি তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
দেশের স্বাধীনতা, সার্বিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব অটুট রাখার পেছনে আত্মোৎসর্গকারী অকুতোভয় শহীদদের অপরিসীম অবদানের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি বলেন, "শহীদদের স্মৃতি ও নাম সর্বদা ইরানি জাতির পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই মূল্যবোধ হস্তান্তর করা একটি জাতীয় ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব।"
তার এই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং এটি সমগ্র ইরানি জাতির আবেগ, আত্মপরিচয় এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক শাশ্বত অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি।
শহীদদের এই পবিত্র রক্তই যে ভবিষ্যতের যেকোনো আগ্রাসনের মুখে দেশের সীমানা প্রাচীরকে আরও সুদৃঢ় ও ইস্পাতকঠিন করে তোলে, সে বিষয়টি তিনি অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন।
এই বিশেষ বৈঠকের একেবারে শেষ পর্বে, ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি দেশের নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক সময়ের অভাবনীয় অগ্রগতি, কাঠামোগত উন্নয়ন ও সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার ওপর একটি বিশদ ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন।
এই আনুষ্ঠানিক ও গোপনীয় প্রতিবেদনে গভীর সমুদ্রে সামরিক অভিযান পরিচালনা, নৌসেনাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন এবং অত্যাধুনিক দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর অভূতপূর্ব অর্জনগুলোর বিস্তারিত বিবরণ অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরা হয়।
আধুনিক প্রযুক্তি ও সম্পূর্ণ নিজস্ব সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই বিশাল ও চৌকস বাহিনী যে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি বা সামুদ্রিক সংকট মোকাবিলায় সর্বদাই প্রস্তুত, তা এই বিস্তৃত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
সবশেষে, কমান্ডার শাহরাম ইরানি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে আবারও আশ্বস্ত করে নিশ্চিত করেন যে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের ভৌগোলিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নৌবাহিনী মুহূর্তের জন্যও তাদের পবিত্র দায়িত্ব থেকে পিছপা হবে না এবং যেকোনো হুমকি প্রতিহত করতে তারা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।