শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেহরানে খামেনির দাফন আনুষ্ঠানিকতা শুরু, বিশ্বনেতা ও বিশিষ্টজনদের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম

তেহরানে খামেনির দাফন আনুষ্ঠানিকতা শুরু, বিশ্বনেতা ও বিশিষ্টজনদের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামেনির চূড়ান্ত বিদায় এবং দাফন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও গভীর শোকের আবহে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

 

ইরানের রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তার মরদেহের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হচ্ছেন দেশ-বিদেশের অগণিত সাধারণ মানুষ, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা। শুক্রবার ভোরে তার এবং তার নিহত সঙ্গীদের মরদেহ এই বিশাল প্রাঙ্গণে নিয়ে আসার পর থেকেই এক অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো অঞ্চলে।

 

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ শুক্রবার এক বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই শোকাবহ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত চল্লিশ দিনব্যাপী এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একেবারে প্রথম দিনেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর এক আকস্মিক ও যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রাণ হারান।

 

তার এই আকস্মিক মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই গোটা ইরানজুড়ে তীব্র শোক এবং একইসঙ্গে এক ধরনের অটুট জাতীয় ঐক্যের আবহ তৈরি হয়েছে।

 

সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার দীর্ঘ দাফন প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করতে এরই মধ্যে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ভারত, জর্জিয়া ও কিউবাসহ বিশ্বের অন্তত ত্রিশটিরও বেশি দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং বিশেষ প্রতিনিধিরা ইরানে এসে পৌঁছেছেন।

 

আন্তর্জাতিক মহলের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আয়োজিত এই দুই দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠানে সর্বস্তরের মানুষের এক বিশাল ঢল নেমেছে। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একান্তই পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে একটি বিশেষ ও ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

এরপর শুক্রবার সকাল থেকে এই প্রাঙ্গণ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ যুদ্ধে নিহত অন্যান্যদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মীরা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের প্রিয় নেতাকে চিরবিদায় জানাতে সেখানে সমবেত হয়েছেন।

 

বিদেশি অতিথিদের মধ্যে সবার আগে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন ইন্দোনেশিয়া এবং আফগানিস্তান থেকে আগত বরেণ্য ধর্মীয় পণ্ডিত ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। এর পাশাপাশি, ইরানের অভ্যন্তরে বসবাসরত বিভিন্ন স্বীকৃত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও গভীর শ্রদ্ধাভরে এই স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, যা দেশের ভেতরের সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ ও আবেগঘন বার্তায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে এই ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় অংশ নেওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

ওই বার্তায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, "ইরান যখন ইসলাম এবং ইসলামী বিপ্লবের একনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ সেবককে চিরবিদায় জানানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, তখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সকল প্রকার ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে শামিল হতে হবে। এটি আমাদের জাতীয় ঐক্য এবং ইসলামের মহৎ আদর্শের প্রতি আনুগত্যের এক স্থায়ী চিত্র তুলে ধরবে।"

 

এমন অভাবনীয় ও স্মরণীয় বিপুল উপস্থিতির মধ্য দিয়ে মূলত জাতীয় ঐক্য, সংহতি এবং ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতি ইরানের আপামর জনসাধারণের অবিচল আনুগত্যের এক চিরস্থায়ী চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

দেশের সাধারণ নাগরিকরা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই শোকযাত্রায় অংশ নেন, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই বিশাল শোকযাত্রা ও দাফন প্রক্রিয়ার পরিধি কেবল রাজধানী তেহরানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।

 

সংবাদমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ও রোববার জুড়ে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় এই শোকানুষ্ঠান ও শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব অব্যাহত থাকবে। এরপর আগামী সোমবার তেহরানের প্রধান রাজপথগুলোতে এক বিশাল এবং স্মরণীয় শোকর‍্যালির আয়োজন করা হবে, যেখানে লাখো মানুষের সমাগম হবে বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে আশা করা হচ্ছে।

 

এই দীর্ঘ সময়কাল পর্যন্ত আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ গ্র্যান্ড মোসাল্লাতেই পরম যত্নে সংরক্ষিত থাকবে। তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের পবিত্র শহর কোমে, যেখানে ধর্মীয় রীতিনীতি ও প্রথা অনুযায়ী আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।

 

শুধু দেশের সীমানাতেই নয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের পবিত্র শহর বাগদাদ, কারবালা এবং নজফেও এই মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ ধর্মীয় কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশ-বিদেশের এই সুদীর্ঘ ও ভাবগম্ভীর শোকযাত্রা শেষে আগামী নয়ই জুলাই ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামেনিকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

 

- মেহের নিউজ