শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খামেনির শেষ বিদায়, বিশ্বনেতাদের উপস্থিতির মাঝেও অনুপস্থিত সৌদি আরব

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম

খামেনির শেষ বিদায়, বিশ্বনেতাদের উপস্থিতির মাঝেও অনুপস্থিত সৌদি আরব
ছবি : Collected

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর লক্ষণীয় অনুপস্থিতি।

 

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র উত্তেজনা এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার থেকে তেহরানে সপ্তাহব্যাপী যে সুবিশাল শোকানুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন শুরু হয়েছে, সেখানে বিশ্বের বহু দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব উপস্থিত হয়েছেন।

 

কিন্তু রিয়াদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিনিধিকে পাঠানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ইতিবাচক ঘোষণা দেওয়া হয়নি, যা আঞ্চলিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সরকারি পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দেশটিতে এক সপ্তাহব্যাপী বিস্তারিত ও সুশৃঙ্খল কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবারের দিনটি বিশেষভাবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে কেবল বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশেষ প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।

 

এদিন তেহরানের একটি নির্ধারিত ও অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার কফিন রাখা হয়েছে, যেখানে বিদেশি অতিথিরা এসে তাদের আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করছেন এবং সম্মান জানাচ্ছেন।

 

তবে শনিবার সকাল থেকে এই শোকানুষ্ঠানের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার কফিন তেহরানের একটি উন্মুক্ত ও বিশাল প্রান্তরে স্থানান্তর করা হবে। আশা করা হচ্ছে, সেখানে লাখো সাধারণ ইরানি নাগরিক তাদের দীর্ঘদিনের নেতার প্রতি শেষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হবেন।

 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি ঐতিহাসিক ও জাতীয় শোকের মুহূর্তে সৌদি আরবের এই নীরবতা ও শারীরিক অনুপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হাউজ অব সৌদ তাদের এক গভীর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, মাত্র চৌদ্দ মাস আগে যখন ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এক মর্মান্তিক ও আকস্মিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন, তখন রিয়াদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়েছিল।

 

সেই সময় সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং তেহরানে গিয়ে সেই বিশাল জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় শোক প্রকাশ করেছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরী কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন স্বাভাবিক হওয়ার পথে হাঁটছিল, তখন সেই পদক্ষেপকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হিসেবেই দেখেছিল বিশ্ব সম্প্রদায়।

 

কিন্তু আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর সৌদি আরবের এই আকস্মিক ও সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবারও এক অজানা ও শীতল সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে। শুক্রবারের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রিয়াদ তাদের কোনো পর্যায়ের প্রতিনিধিকে তেহরানে পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।

 

কেবল আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদি আরবই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য প্রভাবশালী উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও অত্যন্ত সচেতনভাবে এই শেষ বিদায়ের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নিজেদের কোনো প্রতিনিধি বা দূত পাঠায়নি। এই দেশগুলোর দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইন।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দেশগুলোর এমন সম্মিলিত ও যৌথ নীরবতার পেছনে সাম্প্রতিক সময়ের চরম উত্তেজনাকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতি একটি বিশাল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।

 

উল্লেখ্য, গত আটাশে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যখন ইরানের অভ্যন্তরে এক অভাবনীয় ও আকস্মিক সামরিক হামলা চালায়, ঠিক সেই দিনটিতেই আয়াতুল্লাহ খামেনি তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন।

 

এই ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইরান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং পাল্টা হামলা হিসেবে ওই উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো ও কৌশলগত স্বার্থ লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক অভিযান পরিচালনা করে।

 

এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক চরম অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে মনে করছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর এই অনুপস্থিতির পেছনে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল নিহিত রয়েছে।

 

খামেনির মতো এত প্রভাবশালী একজন নেতার মৃত্যুর পর এখন পর্যন্ত এই দেশগুলোর কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় শোকবার্তা বা সমবেদনা প্রেরণ করেনি, যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সাধারণ নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত।

 

এর মাধ্যমে তারা যে কেবল চলমান সংঘাতময় ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে তা নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার পালাবদলের বিষয়েও একটি শক্তিশালী ও নীরব বার্তা প্রেরণ করছে।

 

গভীরভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে শোক না জানানোর এই কৌশলের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মোজতবা খামেনিকে বৈধতা বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা থেকে নিজেদের অত্যন্ত সচেতনভাবে বিরত রাখছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই চিরচেনা জটিল ভূ-রাজনৈতিক দোলাচলে তাদের এই সম্মিলিত অবস্থান আগামী দিনগুলোতে ইরান ও আরব বিশ্বের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক মহল।

 

- হাউজ অব সৌদ