মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর শুক্রবার থেকে ইরান ও ইরাকের অন্তত পাঁচটি শহরে তার দাফন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে তার মরদেহ তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে আসা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিনটি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে স্থাপন করা হচ্ছে।
শোকের প্রতীক হিসেবে কালো পোশাক পরিহিত কর্মকর্তারা কফিনটি যথাস্থানে নামিয়ে রাখেন। পুরো স্থানটিকে লাল গোলাপ এবং বাতাসে উড়তে থাকা সাদা রঙের কৃত্রিম প্রজাপতি দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে, যা গভীর শোক ও শ্রদ্ধার এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের ধারণা, এই দাফন প্রক্রিয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং লাখো সাধারণ মানুষের এক বিশাল সমাগম ঘটবে, যা এটিকে দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রীয় দাফন কার্যক্রমে পরিণত করবে।
ইসলামী সংস্কৃতি ও রীতিনীতি অনুযায়ী মৃত্যুর এত দীর্ঘ সময় পর দাফনকার্য অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত বিরল ও অস্বাভাবিক। তবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং তীব্র অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেই মূলত এই দাফন বিলম্বিত হয়েছে।
সংঘাত বন্ধে সম্প্রতি একটি প্রাথমিক চুক্তির পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়েই এই ঐতিহাসিক কর্মসূচিগুলো আয়োজন করা হচ্ছে। ধর্মীয় বিধান মেনেই তার মরদেহ এতদিন সযতনে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডক্টর মোহাম্মদ ওমর সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, খামেনির মরদেহ প্রায় নিশ্চিতভাবেই হিমায়িত শীতল সংরক্ষণাগারে রাখা হয়েছিল। ইসলাম ধর্মে রাসায়নিক উপাদানের মাধ্যমে মরদেহ সংরক্ষণ বা এমবামিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়ায় এক্ষেত্রে কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়নি।
শিয়া আইন অনুযায়ী, এমন ব্যতিক্রমী ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দাফনে বিলম্ব করা এবং শীতলীকরণের মাধ্যমে মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে। ইরানের ফরেনসিক মর্গগুলোতে প্রয়োজনে কয়েক মাস পর্যন্ত মরদেহ রাখার আধুনিক ব্যবস্থা থাকায় এই চার মাসের সংরক্ষণ প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তিগত দিক থেকে অস্বাভাবিক ছিল না।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ টানা তিন দিন ধরে সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। আগামী সপ্তাহে কোম এবং মাশহাদ শহরে সুবিশাল শোক র্যালির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ প্রতিবেশী দেশ ইরাকের পবিত্র শহর নজফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে আগামী ৯ জুলাই তার জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে অবস্থিত পবিত্র ইমাম রেজার মাজারে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
এই স্মরণীয় দাফন প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা ইরানে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান আলোচনায় অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই শোকানুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এছাড়া ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা উপস্থিত থাকবেন। পাশাপাশি চীন, আফগানিস্তান এবং ককেশাস অঞ্চলে অবস্থিত ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরাও এই ঐতিহাসিক দাফন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন বলে জানানো হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর এত দিন পর অনুষ্ঠিত এই দাফন প্রক্রিয়ার একটি গভীর রাজনৈতিক ও প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এই বিশাল জনসমাগমকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের অবিচল সমর্থন এবং প্রকাশ্য আনুগত্যের এক শক্তিশালী প্রদর্শন হিসেবে দেখছে।
একই সঙ্গে এটি দেশের বিপ্লবী চেতনা এখনও অটুট থাকার প্রমাণ হিসেবেও উপস্থাপিত হচ্ছে। কোম শহরের জুমার নামাজের ইমাম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি মনে করেন, শহীদ নেতা এবং অন্যান্য নিহতদের জানাজায় এই বিপুল উপস্থিতি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের আরেকটি গণরায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।
আয়াতুল্লাহ খামেনি কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী শিয়া ধর্মগুরু, যার অনুসারী ইরাক, পাকিস্তান, লেবাননসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই জানাজা নিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে এক বিশেষ বার্তায় বলেছেন, জনগণের এই উপস্থিতির মাধ্যমে ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় রচিত হবে এবং এর মাধ্যমে গোটা জাতির প্রতিশোধের স্পৃহা সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রতিধ্বনিত হবে।
একই সুরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সব জাতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ইরানিদের এই ঐতিহাসিক জানাজায় অংশ নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, জনগণের এই ব্যাপক উপস্থিতি সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা ও জবরদস্তির বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত জবাব হয়ে উঠবে এবং গোটা বিশ্বের কাছে এই স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেবে যে, ইরানি জাতি তাদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় আগের মতোই ঐক্যবদ্ধ ও অটুট রয়েছে।