ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি এই ঐতিহাসিক সমাগমের তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে এই শেষ যাত্রায় বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ সশরীরে উপস্থিত হয়ে তাদের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।
শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো তেহরান জুড়ে এখন কঠোর নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এই বিশাল আন্তর্জাতিক সমাগমটি ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আয়োজনটির প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী, প্রথম দিন অর্থাৎ শুক্রবার খামেনির মরদেহ রাখা হয়েছে তেহরানের সুপরিচিত ইমাম খোমেনি মসজিদ কমপ্লেক্সে, যা আন্তর্জাতিকভাবে গ্র্যান্ড মোসাল্লা নামে সমধিক পরিচিত। এই দিনটিকে সম্পূর্ণভাবে কেবল বিদেশি প্রতিনিধি ও আমন্ত্রিত বৈশ্বিক মেহমানদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অতিথিদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন পর্ব শেষ হওয়ার পর, শনিবার থেকে এই কফিনটি তেহরানের একটি উন্মুক্ত ও সাধারণ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে, যেন ইরানের আপামর জনসাধারণ তাদের প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখার এবং শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পান।
এই আন্তর্জাতিক সমাগমে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। পাকিস্তান থেকে এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, যিনি সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমন ও একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অগ্রণী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন।
মধ্য এশিয়ার দেশ তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমোনও শুক্রবার সশরীরে তেহরানে পৌঁছেছেন। পাশাপাশি ককেশাস অঞ্চলের দেশ আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাসিনইয়ান তার দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অন্যদিকে জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলি এই শোকানুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকে খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাবেন বলে তার সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র তুরস্কের পক্ষ থেকে দেশটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট কেডভেট ইলমাজ আঙ্কারার প্রতিনিধি হিসেবে এই জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে অবস্থান করছেন।
বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে চীন ও রাশিয়া অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে ইরানের সাথে তাদের কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা প্রদর্শন করেছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির সিনিয়র পার্লামেন্টেরিয়ান হি ওই, যিনি চীনের ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে মস্কোর পক্ষ থেকে খামেনির শেষ বিদায়ে যুক্ত হয়েছেন রাশিয়ার সিকিউরিটি কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ, যিনি দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত মুখ।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে একটি বহুমাত্রিক ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তেহরানে পাঠানো হয়েছে। এই দলে রয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিতা এবং বিহারের বর্তমান গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন।
উল্লেখ্য, সৈয়দ আতা হাসনাইন বর্তমানে ভারতের শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদধারী ব্যক্তি এবং তিনি অতীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অত্যন্ত সম্মানিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই সরকারি পাশাপাশি ভারতের প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ এবং জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও ভারতীয় প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান থেকে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছেন দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি এবং বাণিজ্য বিষয়ক প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী মোল্লা আব্দুল গণি বারাদার।
বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে এই আন্তর্জাতিক শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে তেহরান গিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজুদ্দিন আহমেদ, এবং তার সাথে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিও এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইরানে অবস্থান করছেন। সব মিলিয়ে, এই অন্তিম যাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সমকালীন বিশ্বের এক বিশাল কূটনৈতিক সমাগমে পরিণত হয়েছে।