শুক্রবার, জুলাই ১৭, ২০২৬
২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলি প্রভাব ও অপকৌশল শিগগিরই উন্মোচিত হবে- ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই, ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলি প্রভাব ও অপকৌশল শিগগিরই উন্মোচিত হবে- ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি : File Photo

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও সংঘাত সম্প্রতি সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা লাভ করেছে। এই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলের ব্যাপক ও অন্যায্য প্রভাব নিয়ে এবার অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি শুক্রবার এক বিশেষ বার্তায় দাবি করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যবহার করেই খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরে স্বাধীন ও সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরগুলোকে অত্যন্ত সুকৌশলে স্তব্ধ করে দিচ্ছে তেল আবিব।

 

তবে এই দীর্ঘস্থায়ী অপতৎপরতা এবং পর্দার আড়ালের কূটচাল খুব শিগগিরই বিশ্ববাসীর সামনে সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানামুখী বিশ্লেষণ চলমান রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে পার্সটুডে তাদের এক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি মার্কিন প্রশাসন ও দেশটির সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক করে এই তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন।

 

তিনি তার পোস্টে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভিন্ন সময় অন্যান্য বিদেশি রাষ্ট্রের কাল্পনিক প্রভাব ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পর্কে বারবার সতর্ক করা হয়ে থাকে। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহল প্রায়শই বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনে থাকে।

 

কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাশক্তির সরকারকে মিথ্যাচার ও চরম প্রতারণার মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইসরায়েল যে ধারাবাহিক ও ব্যাপক উসকানি দিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে দেশটির নীতি নির্ধারকেরা রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন।

 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও গভীর শঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, ইসরায়েলের এই উসকানিমূলক ও আগ্রাসী আচরণের পরিণতি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।

 

তিনি তার বার্তায় সুস্পষ্টভাবে এই প্রশ্ন তুলেছেন যে, যে যুদ্ধে নিশ্চিতভাবে কোনো পক্ষেরই চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে না এবং যা কেবল ধ্বংস ডেকে আনবে, সেই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর এই জঘন্য ষড়যন্ত্রের জবাব কে দেবে?

 

আরাকচি অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, এর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর ও নিন্দনীয় বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। তার দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েল মূলত মার্কিন করদাতাদের বিপুল পরিমাণ অর্থকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

 

আর সেই অর্থের জোরেই খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তাদের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি যৌক্তিক, স্বাধীন ও সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরকে তারা নির্মমভাবে দমন করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচির এই বক্তব্য নিছক কোনো রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং এটি ওয়াশিংটনের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা।

 

দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে এই অভিযোগ রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থাকা শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলো ওয়াশিংটনের বৈদেশিক নীতি, সামরিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাপক ও একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মূলত সেই অদৃশ্য প্রভাব বলয়ের দিকেই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের চেয়ে মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার্থে নিজেদের অর্থ, সামরিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সুনাম অযথাই অপচয় করছে।

 

এই ধরনের একপেশে নীতি শেষ পর্যন্ত খোদ মার্কিন নাগরিকদের জন্য চরম ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই সচেতনতামূলক পোস্টের সমাপ্তি টানতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

 

তিনি তার লেখার শেষাংশে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেছেন যে, এই সামগ্রিক চক্রান্ত, মার্কিন অর্থের অপব্যবহার এবং আমেরিকার সাধারণ জনগণকে অন্ধকারে রেখে তাদের সরকারকে একটি অর্থহীন ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়াটি আর বেশিদিন গোপন থাকবে না।

 

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, খুব শিগগিরই এই সমস্ত অপকৌশল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র এবং ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্রের মুখোশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচির এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

আগামী দিনগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার এই রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও কতখানি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

 

- পার্সটুডে