শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মোহসেন রেজায়ীর কড়া হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী আচরণ অব্যাহত থাকলে আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাবে ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০১:০৪ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী আচরণ অব্যাহত থাকলে আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাবে ইরান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এখন এক নতুন ও ভয়াবহ মোড় নিতে যাচ্ছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক শীর্ষ কমান্ডার এবং বর্তমান সামরিক কৌশলবিদ মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ী সম্প্রতি মার্কিন প্রশাসনের প্রতি এক কঠোর ও চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

 

তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন যদি তাদের বর্তমান বৈরী আচরণ, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং যুদ্ধংদেহী নীতি অব্যাহত রাখে, তবে ইরান আর কেবল প্রতিরক্ষামূলক বা প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবে না।

 

বরং আগামী দিনগুলোতে তেহরান সরাসরি আক্রমণাত্মক পর্যায়ে প্রবেশ করতে বাধ্য হবে, যার পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ। শুক্রবার রাতে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ ও দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাগুলো এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে প্রচার করেছে। মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ীর এই অভাবনীয় ও কড়া বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত মার্কিন প্রশাসনকে একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

 

তিনি তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন, আধিপত্যবাদী আচরণ এবং আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করার বিভিন্ন দিক অত্যন্ত বিশদভাবে তুলে ধরেন।

 

বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক বাতিল করার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে ট্রাম্প যে এই সমঝোতা স্মারকটি একতরফাভাবে ছিঁড়ে ফেলবেন বা বাতিল করবেন, সে বিষয়ে আগে থেকেই যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

 

তবে তার মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চুক্তি বাতিলের ঘোষণার অনেক আগেই ওয়াশিংটন কার্যত এই সমঝোতার প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি ধারা চরমভাবে লঙ্ঘন করে এটিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর একটি দলিলে পরিণত করেছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের অবিশ্বস্ততার প্রমাণ দেয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারাবাহিক চুক্তি লঙ্ঘনের প্রথম ও অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত হিসেবে মোহসেন রেজায়ী লেবানন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননে একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে।

 

শুধু তাই নয়, ওই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নিশ্চিত করার যে দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের ছিল, তারা তা পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার সকল আন্তর্জাতিক উদ্যোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

সমঝোতার দ্বিতীয় প্রধান লঙ্ঘনটি ঘটেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে। রেজায়ীর মতে, এই প্রণালীতে বৈধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের পথ সর্বদা উন্মুক্ত থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেখানে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

 

তারা ইরানের আইনি তত্ত্বাবধান ও নজরদারির সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে, বেআইনিভাবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজগুলোকে প্ররোচিত করেছে এবং পথনির্দেশনা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল আইন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি এটি একটি চরম অবজ্ঞা ও সরাসরি উসকানি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

স্বভাবতই, নিজেদের পানিসীমা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে তেহরান এই ধরনের বেআইনি অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় ইরান সংশ্লিষ্ট অবৈধ জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ও সামরিক ব্যবস্থা নেয়।

 

কিন্তু এই বৈধ পদক্ষেপের জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী চরম আক্রমণাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেয়। তারা সম্পূর্ণ অন্যায্যভাবে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চল, বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ এবং সাধারণ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোর ওপর সরাসরি বর্বরোচিত সামরিক হামলা চালায়।

 

মেজর জেনারেল রেজায়ী অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অযাচিত সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে মূলত দুই দেশের মধ্যেকার পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যে প্রথম ও প্রধান ধারাটি ছিল, তা চূড়ান্তভাবে পদদলিত ও লঙ্ঘিত হয়েছে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ইরানের এই বর্ষীয়ান সামরিক নেতা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট পাঁচটি বড় ধরনের চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া, বৈধ ও নিরাপদ ইরানি নৌপথ খোলা থাকা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালীতে উসকানিমূলকভাবে অবৈধ পথ তৈরি করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সেখানে চালিত করা।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন না করা, ইরানের উপকূলীয় ও বেসামরিক স্থাপনায় সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালানো এবং সর্বশেষ, আন্তর্জাতিকভাবে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা ইরানের নিজস্ব বিপুল পরিমাণ আর্থিক সম্পদ অবমুক্ত না করা।

 

এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহের দিকে ইঙ্গিত করে মোহসেন রেজায়ী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড, চুক্তি লঙ্ঘন এবং অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যায়, তবে ইরানও তাদের সামরিক নীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক পর্যায়ে প্রবেশের সরাসরি হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত। যদি সত্যিই এই সংঘাত আরও বৃদ্ধি পায় এবং ইরান আক্রমণাত্মক অবস্থানে যায়, তবে তা কেবল এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং ভূরাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়বে।

 

- পার্সটুডে