ওই অঞ্চলের অন্তত ২০টি গ্রামে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে মরু ও উপকূলীয় ওই শুষ্ক এলাকার প্রায় ১০ হাজার সাধারণ মানুষ পানীয় জলের তীব্র সংকটের মুখে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত প্রতিবেদন থেকে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রত্যক্ষ ও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত হরমোজগান প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু অত্যন্ত শুষ্ক প্রকৃতির। প্রাকৃতিকভাবে মিঠা পানির উৎস সেখানে একেবারেই নগণ্য।
এই কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনধারণ মূলত সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিশোধন করার ওপর নির্ভরশীল। বুনজি গ্রামের এই পানি পরিশোধন কেন্দ্রটি ছিল ওই ২০টি গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সামরিক এই হামলায় ওই পরিশোধন কেন্দ্রের মূল অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্র থেকে পানি উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত প্রধান পাম্পিং স্টেশন এবং সম্পূর্ণ কেন্দ্রটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বিশালাকার ট্রান্সফরমারটি শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
কেন্দ্রটির কার্যকারিতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় পানি পরিশোধন ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়াটি আকস্মিকভাবে থমকে গেছে। বেসামরিক এই স্থাপনায় হামলার ঘটনায় ইরানের স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
হরমোজগান প্রদেশের পানি ও পয়োনিষ্কাশন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হামজেহ পুর এই হামলার কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানিয়েছেন। গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, এটি কেবল একটি সাধারণ সামরিক অভিযান নয়; বরং এটি একটি 'ধারাবাহিক অপরাধ ও সন্ত্রাসী হামলা'।
তার মতে, বেসামরিক নাগরিকদের জীবনধারণের প্রধান উপাদানের ওপর এমন সুপরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্পষ্ট করে বলেন, পাম্পিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে ২০টি গ্রামের নিরপরাধ বাসিন্দারা এখন আক্ষরিক অর্থেই বেঁচে থাকার অস্তিত্বের সংকটে রয়েছেন।
এই হামলার সরাসরি ফলশ্রুতিতে ওই এলাকার নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। বিকল্প কোনো নির্ভরযোগ্য পানির উৎস না থাকায় হাজার হাজার মানুষ এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
জরুরি ভিত্তিতে ওই অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভ্রাম্যমাণ ট্যাংকারের মাধ্যমে পানি বিতরণের মতো বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবলেও, প্রত্যন্ত ওই অঞ্চলগুলোতে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটানো বাস্তবিকভাবে অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল।
তাছাড়া, ধ্বংসপ্রাপ্ত ট্রান্সফরমার ও পাম্পিং স্টেশনটি পুনরায় স্থাপন এবং পুরো ব্যবস্থাটি আগের মতো সচল করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এই মধ্যবর্তী সময়ে সেখানকার বাসিন্দাদের কীভাবে পানীয় জল সরবরাহ করে বাঁচিয়ে রাখা হবে, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
বিশ্বের যেকোনো সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক নাগরিক এবং তাদের জীবনযাত্রার জন্য অপরিহার্য স্থাপনাগুলোকে (যেমন-হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা) লক্ষ্যবস্তু করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তা সত্ত্বেও, জাস্ক কাউন্টির এই পানি পরিশোধন কেন্দ্রে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সংঘাতে সাধারণ প্রান্তিক মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের হামলা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে ও বিপজ্জনক করে তুলবে।
এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক শুধু দীর্ঘায়িতই হবে না, বরং সাধারণ মানুষের প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবিলম্বে ওই দুর্গত এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো একান্ত প্রয়োজন।
একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে এই ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বুনজি ও এর আশেপাশের গ্রামগুলোর ১০ হাজার মানুষের জীবন এখন সুতোর ওপর ঝুলছে। এই সংকট নিরসনে দ্রুত কোনো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে, সেখানে একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য ও মানবিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।