শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চরম উত্তেজনার জেরে ইরানের চার প্রদেশে ফাইনাল পরীক্ষা বাতিল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম

চরম উত্তেজনার জেরে ইরানের চার প্রদেশে ফাইনাল পরীক্ষা বাতিল
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এখন এক চরম ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। টানা এক সপ্তাহ ধরে ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক ও ধারাবাহিক বিমান হামলার জেরে সমগ্র অঞ্চলে এক গভীর অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।

 

এই সামরিক আগ্রাসনের বিপরীতে বসে নেই তেহরানও। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে সমান্তরালভাবে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।

 

দেশজুড়ে চলমান এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও গভীর নিরাপত্তা সংকটের কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে স্কুল পর্যায়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা আকস্মিকভাবে বাতিল ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার।

 

শনিবার কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ও সরকারি সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক জরুরি নির্দেশনায় জানানো হয়েছে যে, চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে আগামীকাল রোববার ও সোমবার দক্ষিণাঞ্চলের চারটি নির্দিষ্ট প্রদেশে একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পূর্বনির্ধারিত ফাইনাল পরীক্ষা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে।

 

ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উদ্ভূত তীব্র সামরিক অস্থিতিশীলতা এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার চরম ঝুঁকির কারণেই সরকার বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই বিশেষ নির্দেশনাটি মূলত হরমোজগান, বুশেহর, খুজেস্তান এবং সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের জন্য কার্যকর হবে। তবে মন্ত্রণালয় এটিও সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, বাতিল হওয়া এই পরীক্ষাগুলোর জন্য নতুন তারিখ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সাপেক্ষে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।

 

অন্যদিকে, দেশের অন্যান্য সব প্রদেশের ফাইনাল পরীক্ষা এবং বাতিল হওয়া এলাকাগুলোর অন্যান্য পুনর্নির্ধারিত পরীক্ষা তাদের নিজস্ব পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে। মার্কিন বাহিনীর এই ধারাবাহিক সামরিক অভিযান শুধু সামরিক স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বেসামরিক অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও এর প্রত্যক্ষ ও ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

 

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে মরু ও উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন সুপেয় বা বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যা একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে।

 

তাসনিম নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে হরমোজগান ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্টওয়াটার কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হামজেহ পুর জানান যে, ইরানের জাস্ক কাউন্টির উপকূলীয় বুঞ্জি গ্রামে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানি পরিশোধন পাম্পে মার্কিন বাহিনী সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়েছে।

 

এই অতর্কিত হামলায় ওই এলাকার প্রায় দশ হাজার জনসংখ্যার অন্তত বিশটি গ্রামে সুপেয় পানির সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বেসামরিক এই স্থাপনায় হামলার ঘটনায় ইরানের স্থানীয় প্রশাসন তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে।

 

হরমোজগান প্রদেশের পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হামজেহ পুর এই মার্কিন সামরিক হামলাকে একটি ধারাবাহিক অপরাধ ও সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান যে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এই হামলার ফলে সমুদ্র থেকে সরাসরি পানি উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত প্রধান পাম্পিং স্টেশন এবং বুঞ্জি পানি পরিশোধন কেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বিশালাকার ট্রান্সফরমারটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।

 

এর ফলে ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন এবং তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অন্যদিকে, এই সামরিক অভিযানের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ইরানে টানা সাত রাত ধরে তাদের সামরিক অভিযান অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

 

মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ তথা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ইরানের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধাস্ত্রের ভাণ্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে তাদের এই আক্রমণাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসনের মুখে ইরানও অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে এই বেআইনি বিমান অভিযান ও সামরিক আগ্রাসন বন্ধের জন্য জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, মার্কিন বাহিনী যদি তাদের এই একগুঁয়ে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে ইরান বাধ্য হয়ে একটি পূর্ণমাত্রার ও সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে।

 

শুক্রবার রাতের মার্কিন হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে এক কড়া বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি মার্কিন প্রশাসনকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন ধ্বংসাত্মক হামলা অব্যাহত রাখে, তবে সে ক্ষেত্রে ইরান আর নিজেকে শুধু প্রতিরক্ষামূলক বা পাল্টা হামলার গণ্ডির মধ্যেই সীমিত রাখবে না; বরং তারা পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধে নামবে।

 

আর সেই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমান্তই আর সুরক্ষিত থাকবে না, যার পরিণতি হবে সমগ্র অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক।

 

- আল জাজিরা