দেশটির ভূখণ্ডে কিংবা যেকোনো রাষ্ট্রীয় ও বেসামরিক অবকাঠামোতে সামরিক বা অন্য যেকোনো ধরনের আক্রমণ চালানো হলে তার জবাবে চরম এবং ধ্বংসাত্মক আঘাত হানা হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে ঘোষণা করেছেন যে, তাদের ওপর কোনো পক্ষ আঘাত হানলে তার জবাব হবে সমপর্যায়ের, তাৎক্ষণিক এবং ভয়াবহ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই বিবৃতিটি এমন এক সময়ে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে, যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি বিশেষ, উন্মুক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানের এই অনমনীয় প্রতিরোধ নীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি মূলত একটি প্রাচীন এবং অত্যন্ত পরিচিত প্রবাদ ব্যবহার করে নিজেদের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। আব্বাস আরাগচি তাঁর বার্তায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন, তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি একেবারেই পরিষ্কার এবং তা হলো ‘চোখের বদলে চোখ’।
এই নীতির সরল অর্থ হলো, যে মাত্রায় এবং যে ধরনের ভয়াবহ ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ইরানের ওপর কোনো শত্রুপক্ষ হামলা চালাবে, ঠিক একই মাত্রায় এবং সমপরিমাণ ধ্বংসাত্মক পরিণতি আক্রমণকারী দেশ বা গোষ্ঠীকে ভোগ করতে হবে।
এই নীতির মাধ্যমে ইরান মূলত তাদের আধুনিক সামরিক সক্ষমতা, নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্রভাণ্ডার এবং যেকোনো আগ্রাসন সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলার মানসিক প্রস্তুতির বিষয়টিই সমগ্র বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর এই কঠোর বার্তায় আরও বিশদভাবে জানান যে, সামরিক কিংবা বেসামরিক অবকাঠামোসহ ইরানের ওপর পরিচালিত যেকোনো ধরনের আগ্রাসন ওয়াশিংটন বা অন্য যেকোনো পক্ষের জন্যই একটি শক্তিশালী, ভয়াবহ ও নির্ণায়ক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনবে।
এখানে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করার বিষয়টি কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সাহসী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে তেহরান মূলত ওয়াশিংটন এবং তাদের বৈশ্বিক মিত্রদের এই কঠোর বার্তাই দিতে চাইছে যে, সরাসরি সামরিক আক্রমণ কিংবা প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের কোনো ক্ষতি করার অপচেষ্টা করা হলে তা বিনা জবাবে বা নীরবতার সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
ইরানের নিজস্ব সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র, তেল শোধনাগার কিংবা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে সামান্যতম আঘাত এলে তার পাল্টা সামরিক জবাব হবে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত এবং শত্রুর জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ।
কেবল সরাসরি আক্রমণকারী রাষ্ট্রগুলোর জন্যই নয়, বরং যারা নেপথ্যে থেকে এই ধরনের সামরিক হামলায় লজিস্টিক বা অন্য কোনো সহায়তা করবে, তাদের জন্যও যে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শীর্ষ এই ইরানি কূটনীতিক।
আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেন যে, যেসব দেশ বা গোষ্ঠী ইরানের ওপর এ ধরনের বিমান বা সামরিক হামলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য বা সমর্থন জোগাবে, তারাও তেহরানের সামরিক বাহিনীর জন্য ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য হবে।
আন্তর্জাতিক সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সরাসরি বার্তার মাধ্যমে ইরান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে এবং ওই অঞ্চলে থাকা পশ্চিমাদের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিকে সতর্ক করেছে।
প্রতিবেশী বা আঞ্চলিক কোনো দেশ যদি নিজেদের আকাশসীমা, নৌপথ বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ করে দেয়, তবে সেই দেশটিকেও সমান অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান এবং সেখানেও বিনাদ্বিধায় শক্তিশালী প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হবে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের বরাতে প্রকাশিত এই সংবাদটি বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নানা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে, বিশেষ করে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ এবং প্রচ্ছন্ন সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই উত্তেজনা যেন আরও ঘনীভূত হয়ে বিস্ফোরণোন্মুখ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঠিক এমন একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সরাসরি সামরিক হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি শুধুমাত্র কোনো কূটনৈতিক ফাঁকা বুলি নয়, বরং এটি তাদের কয়েক দশক ধরে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি এবং যেকোনো মূল্যে আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট কৌশল।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বিবৃতি সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন বার্তা দিচ্ছে যে, তেহরান তাদের জাতীয় নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো পরাশক্তির কাছেই মাথা নত করবে না বা আপস করবে না।
বহিঃশত্রুর যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা নিজেদের সামরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য এক নতুন সামরিক ও কূটনৈতিক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ, ইরানের ওপর যেকোনো অবিবেচনাপ্রসূত বা হঠকারী সামরিক আক্রমণ শুধু মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এক ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই এখন এই কঠোর হুঁশিয়ারির বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।