শুক্রবার, জুলাই ২৪, ২০২৬
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ

মো. নাঈম ইসলাম

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের দখলকৃত পশ্চিম তীরের একটি গ্রামে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী এবং স্থানীয় ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার, ২৪ জুলাই সংঘটিত এই আকস্মিক ও সহিংস ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে।

 

নিহতদের মধ্যে তিনজন ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী রয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্যমতে, পশ্চিম তীরের ‘তেল’ নামক একটি শান্ত গ্রামে সশস্ত্র ইসরায়েলিদের অনধিকার প্রবেশের মধ্য দিয়েই মূলত এই প্রাণঘাতী উত্তেজনার সূত্রপাত হয়।

 

এই ঘটনার পর সমগ্র পশ্চিম তীর জুড়ে চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দখলকৃত এই ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের এটি একটি নবতর ও উদ্বেগজনক সংযোজন।

 

ফিলিস্তিনি সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, শুক্রবার দিনের বেলায় একদল সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত তেল গ্রামে প্রবেশ করে।

 

ফিলিস্তিনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ফাতাহ পার্টির স্থানীয় নেতা ইসাম সাইফি বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনার শুরুতে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ জনের একদল উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ওই গ্রামের পূর্বাঞ্চলে অতর্কিতভাবে হানা দেয়।

 

তারা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে স্থানীয় দুটি ফিলিস্তিনি বসতবাড়িতে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। এ সময় ওই বাড়িগুলোর সাধারণ বাসিন্দারা নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাধা প্রদান করলে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

 

প্রাথমিকভাবে স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে তারা কিছুটা পিছু হটলেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিনিয়তই এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।

 

স্থানীয় ফিলিস্তিনি নেতাদের মতে, প্রাথমিক ধস্তাধস্তির কিছুক্ষণ পরেই ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা আরও সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র অবস্থায় ওই এলাকায় পুনরায় ফিরে আসে। দ্বিতীয় দফায় ফিরে আসার পর তারা চরম আগ্রাসী হয়ে ওঠে এবং কোনো কারণ ছাড়াই স্থানীয় এক ফিলিস্তিনি শিশুর ওপর অস্ত্র দিয়ে বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে তাকে মারাত্মকভাবে আহত করে।

 

নিরীহ শিশুর ওপর এমন নিষ্ঠুর আঘাতের ঘটনায় গ্রামের ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তারা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সংঘাতের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, এক ফিলিস্তিনি নাগরিক আত্মরক্ষার্থে এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর কাছ থেকে তার আগ্নেয়াস্ত্রটি ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হন এবং পাল্টা গুলি বর্ষণ করেন। এই গুলির আঘাতেই ঘটনাস্থলে ওই ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিহত হন, যা পুরো সংঘাতকে এক নতুন ও মারাত্মক মাত্রা প্রদান করে।

 

ইসরায়েলি নাগরিকের নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই পরিস্থিতি এক ভয়ানক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদস্যরা।

 

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, পরিস্থিতি শান্ত করার বা নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে ইসরায়েলি সেনারা সেখানে এসেই স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। একই সময়ে সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরাও ফিলিস্তিনিদের ওপর তাদের আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার অব্যাহত রাখে।

 

ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের এই যৌথ ও সমন্বিত সশস্ত্র হামলায় ঘটনাস্থলেই অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নাগরিক নির্মমভাবে প্রাণ হারান। নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর এমন সামরিক ও বেসামরিক আগ্রাসন পুরো অঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনার পর তেল গ্রাম এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে এক অবর্ণনীয় ভীতি ও তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রতিশোধ নিতে উগ্রপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা এখন দলবদ্ধভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর আরও বড় আকারের হামলা চালানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ হচ্ছে।

 

তারা ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিসহ যাবতীয় সহায়-সম্পদ ধ্বংস করে দেওয়ার এবং সাধারণ মানুষদের হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বিবেচনা করে আসছে।

 

তবুও প্রতিনিয়ত এমন জমি দখল ও হামলার ঘটনা ওই অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়াকে বারবার ব্যাহত করছে। সংঘাতময় এই পরিস্থিতি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে তা এক ভয়াবহ আঞ্চলিক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।

 

দখলকৃত পশ্চিম তীরে এ ধরনের সংঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল এই ভূখণ্ডটি দখল করে রেখেছে এবং সেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অবৈধ বসতি নির্মাণ করছে। জাতিসংঘের প্রস্তাবনা ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলো সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও ইসরায়েল সরকার বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে।

 

ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখলেও, ক্রমাগত এই বসতি সম্প্রসারণ এবং সশস্ত্র হামলা তাদের সেই স্বপ্নকে ক্রমশই কঠিন করে তুলছে।

 

সাম্প্রতিক এই প্রাণহানির ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার ফিলিস্তিনিদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানালেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনও চরম নৈরাশ্যজনক।

 

- টাইমস অব ইসরায়েল